কবিতার আপডেট – আপডেটেড কবিতা (৫)
মুরারি সিংহ
মাননীয় পাঠক, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মতে বেদবাক্য নাকি খণ্ডণ করা যায় না। অথচ আর্যদের এই আদি রচনা কোনো অচল-অনড় কিছু আপ্তবাক্যের সংকলন নয়, বরং কাল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখার জন্য কালোপযোগী করে তোলার তাগিদ তারও যে ছিল, একথাটা বেদের দশম মণ্ডলের সূক্তগুলির উপর চোখ বোলালে পদে পদে বোঝা যায়। সামাজিক বিবর্তনের স্বাভাবিক ধারায় ঋকবেদের বিষয়-আশয় কী আশ্চর্যজনক ভাবে বদলে গেছে, দেবস্তুতি থেকে সরে এসে কীভাবে সেখানে প্রণয় ও কামাসক্তি জায়গা করে নিয়েছে সে প্রসঙ্গে অগস্ত্য-লোপামুদ্রার আলাপের কথা আগেই বলেছি এবার আরো দুটি সংলাপ-ধর্মী সূক্তর কথা বিশেষ করে বলা দরকার। দশম মণ্ডলের দশম সূক্তটির কথাই ধরুন। যম এবং যমী জমজ ভাইবোন। এখানে তাদের একটি কথোপকথন লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আর কী আশ্চর্য সেখানে যমী কামের চোটে নিজের সহোদরকেই শয্যা-সঙ্গী হবার জন্য পীড়াপিড়ি শুরু করেছে। সহবাস করে যমের সন্তান গর্ভে ধারণ করার জন্য ইনিয়ে-বিনিয়ে যমীর সেকী কাকুতি-মিনতি। কিন্তু যম কিছুতেই রাজি হচ্ছে না আদরের বোনকে বোঝাচ্ছে ছিঃ এমন কাজ করতে নেই করলে পাপ হয়। বুঝুন কাণ্ড, এ হেন সংলাপও আর্যদের পবিত্র গ্রন্থে জায়গা করে নিয়েছে এবং যমের সঙ্গে যমীকেও সেখানে দেবতা বানানো হয়েছে। এই প্রসঙ্গে দশম মণ্ডলের ৯৫ সূক্তটির কথাও বলতে হয়। সেটি আবার একটি প্রণয়-কাহিনির অংশবিশেষ। গল্পটা আমরা সবাই জানি স্বর্গের অপ্সরা ঊর্বশীর সঙ্গে মর্ত্যের রাজা পুরুরবার সেই বিখ্যাত প্রেম। ঋকবেদের এই সূক্তই সেই গল্পের উৎস। এটি একটি নিখাদ প্রেম কাহিনি। মর্ত্যবাস সাঙ্গ করে ঊর্বশী স্বর্গে ফিরে যাচ্ছে, পুরুরবা কিছুতেই তাকে ছাড়বে না। অর্থাৎ নাটকের শেষ দৃশ্য তার যাবতীয় দুঃখ-বেদনা নিয়ে হাজির। যজ্ঞকর্মে এমন প্রেম কী কাজে লেগেছিল জানি না, তবে দেখা যাচ্ছে এখানে ঊর্বশী অর্থাৎ স্বর্গের একজন নর্তকী ও যৌনকর্মী এবং পুরুরবা যে কিনা মর্ত্যের মানব তাদের দুজনকেও দেবতা বানানো হয়েছে। এবার একটু রসের কথায় আসা যাক। বেদে একটাই রস। সোমরস যা এক রকম সুরা। বৈদিক যুগে আর্য-ঋষিদের মদ্যপান প্রীতি আমাদের অজানা নয়। তো ঋষি-মশাইরা উপাসনায় বসে (তখন তো পুজো ছিল না) সেই মদকেও দেবতা বানিয়ে দিল। নবম মণ্ডলের ১১৪টি সূক্ত সবগুলিই পবমান সোম দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এটাও একটা আপডেট বৈকি। আবার যে সব পাথর দিয়ে সোম লতাকে থেঁতো করে মদ বার করা হত তাদেরকেও দেবতা বানানো হয়েছে দশম মণ্ডলের ১৭৫ সূক্তে। এমন কি তার্ক্ষ্য নামের যে পাখি দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত সোম বয়ে নিয়ে যেত সেই পাখিই বা বাদ যায় কেন অতএব তাকেও দেবতা বানিয়ে দাও (১০.১৭৮)। একই ভাবে দেব-উপাসনা থেকে নানা স্তোত্রের বিষয়বস্তুর ভিতর জায়গা করে নিয়েছে ভেষজ-চিকিৎসা, ইন্দ্রজাল বা জাদু, বিবাহসংগীত, অন্তেষ্টিবিষয়ক-মন্ত্র, পাশাখেলা, অরণ্যানী, এমনকি ক্রোধ, অলক্ষ্মীনাশ, প্রেতাত্মা, গর্ভরক্ষা, যক্ষ্মারোগনাশ, পাপনাশ, ভয়নাশ, দুর্গতিনাশ, দুর্মতিদূর, দুঃস্বপ্ননাশ, বিষ-নাশ, গর্ভনাশ, কুষ্ঠনাশ, ব্যাঙেদের উল্লাস, ইত্যাদি। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ঋকবেদের শেষের দিকে বেশ কিছু মন্ত্রের বিষয়বস্তুর প্রকৃতির মধ্যে একটা মৌলিক পরিবর্তন এসে গেছে। মন্ত্রগুলি হয়ে উঠেছে পার্থি্ব, মানবিক এবং জীবনমুখী। সব চেয়ে মজার হল দশম মণ্ডলেরই ৩৪ সূক্তটি যার বিষয় পাশাখেলা এবং সেখানে অক্ষকে দেবতা বানানো হলেও সব কটি ঋকেই পাশাখেলার প্রতি আসক্তি মানুষের কী সর্বনাশ করে তারই ফিরিস্তি, অর্থাৎ পশাখেলার নিন্দা করা হয়েছে। দেব-স্তুতির বদলে দেব-নিন্দা ঋকবেদ-সংহিতার এই আপডেট সত্যিই অবাক করার মতো ঘটনা। বোঝা যাচ্ছে এই পর্বে বৈদিক-সমাজও কতটা বদলেছে এবং তার মূলে অবশ্যই আর্য-সভ্যাতার অনার্যায়ন।
No comments:
Post a Comment