কবিতার আপডেট – আপডেটেড কবিতা (৪)
শুধু পুরুষ-সূক্ত বা দেবী-সূক্তের পরস্পর-বিরোধিতা নয় বৈদিক যুগে কবিতার আপডেট প্রসঙ্গে অবশ্যই বলা দরকার ঋকবেদের বেশ কিছু সূক্তে আরো অনেক ভিন্ন সুর বেজে উঠেছে। তাদের মধ্যে আবার যে গুটি কতক স্তোত্র মেয়েদের লেখা। যেমন প্রথম মণ্ডলের ১৭৯ সূক্তটি। এটি অগস্ত্য ও তাঁর পত্নি লোপামুদ্রার কথোপকথন। সুতরাং তারাই সূক্তটির ঋষি। আশ্চর্যভাবে সেখানে প্রথাগত কোনো দেবতার উপস্থিতি নেই। কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে স্তোত্রটি নিবেদিত হল না। তবে যেহেতু আলাপচারিতার বিষয়-বস্তু নারী-পুরুষের রতি বা সম্ভোগ, তাই পণ্ডিতরা রতিকেই সেখানে দেবতা বানিয়ে দিলেন। প্রথমেই লোপামুদ্রা বলছে বছরের পর বছর রাতদিন অগস্ত্যর সেবা করে সে ক্লান্ত। বয়সের কারণে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লোপামুদ্রার যুক্তিতে দেবতাদের সঙ্গে যে সব ঋষি সত্যকথা আলোচনা করেন তারাও তো সমানে প্রণয়সুখ সম্ভোগ করেছেন। থই পাননি। সুতরাং সেই সম্ভোগকামী নারীর প্রার্থনা তাহলে পুরুষ স্ত্রীর কাছে যাক। উত্তরে অগস্ত্য বলছে আমরা সমস্ত ভোগই উপভোগ করতেই পারি, যদিও আমি আপাতত জপ ও সংযম নিয়ে আছি তবু আমার মধ্যেও প্রণয় জেগে উঠছে। এখন লোপামুদ্রা তার পতিকে উপভোগ করতেই পারে। অর্থাৎ এই প্রথম দেব-দেবীকে পাশ কাটিয়ে ঋকবেদে মানব-মানবীর প্রেম মানে একেবারে রতির কথা বলা হল। পঞ্চম মণ্ডলের ২৯ সূক্তটিও এক নারীর লেখা। নাম বিশ্ববারা। তিনি অত্রি গোত্রের কন্যা। একজন মহিলা হয়ে পুরুষদের পাশাপাশি তিনিও অগ্নি-দেবতার উদ্দেশ্যে স্তব উচ্চারণ করছেন অর্থাৎ পুরোহিতের কাজ করছেন। নারী-সুলভ ভঙ্গিতেই এই শ্লোকের একটি মন্ত্রে সুশৃঙ্খল দাম্পত্য জীবন কামনা করা হয়েছে। এবার আসা যাক অষ্টম মণ্ডলের ৯১ সূক্তটিতে। এখানে দেবতা সেই বহু-চর্চিত ইন্দ্র হলেও তার রচয়িতা আরেক নারী অপালা। তিনি অত্রি-কন্যা। তার শরীরে চর্মরোগ হয়েছিল এবং স্বামী তাকে ত্যাগ করেছিল। তার ঠাঁই হয়েছিল বাবার ঘরে। তার সেই জন্মদাতার মাথা ছিল কেশশূন্য। এই স্তবে তাই দেখা যাচ্ছে অপালার পক্ষ থেকে যেমন পতি-পরিত্যক্ত নারীদের হয়ে ইন্দ্রের-সঙ্গ কামনা করা হয়েছে, তেমনি নষ্ট-ত্বক উজ্জ্বল করার কথা বলা হয়েছে। আবার টাক মাথায় চুল-গজানোর কামনাও করা হয়েছে। দশম মণ্ডলের ৩৯ এবং ৪০ সূক্ত দুটি আরেক নারীর লেখা, তিনি ঘোষা, কক্ষীবান ঋষির কন্যা, কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত।দুটি স্তোত্ররই দেবতা অশ্বিদ্বয়। ঋকবেদের দেবতা এই বিখ্যাত অশ্বজোড়া সব সময় একটি সুন্দর রথকে বয়ে নিয়ে যায়, তারা দুজনেই দক্ষ চিকিৎসক, বৃদ্ধকে নবযৌবন দান করে, দুর্গতকে উদ্ধার করে, ঘটকালি করে মেয়েদের বিয়ে দেয়, গাভিলে দুগ্ধবতী করে, সুতরাং ঘোষা তাদের বন্ধুত্ব কামনা করে দাম্পত্য সুখ কেমন তা বুঝিয়ে দিতে বলছে। এই সূক্তেই নারীদের দেওরকে বিয়ে করার এবং নারীর ব্যাভিচারের কথারও উল্লেখ আছে। দশম মণ্ডলেরই ১৪৫ সূক্তটি আবার বেশ মজার। দেবতার নাম সপত্নীপীড়ন। রচয়িতা ইন্দ্রানী নামের এক মহিলা। সপত্নীপীড়ন দেবতার মানে যে দেবতার উপাসনা করলে সতীনকে বশে আনা যায়। আসলে সেটি এমন একটি শক্তিশালী লতা বা ওষধি যা প্রয়োগ করে একদিকে তীব্র যন্ত্রণা দেবার মধ্যে দিয়ে সতীনকে জব্দ করা যায় অন্যদিকে স্বামীকেও নিজের বশীভূত করা যায়। সেই লতাকেও এখানে দেবতা বানিয়ে দেওয়া হল। এই স্তোত্রতে থেকে যেমন বোঝা গেল সেকালেও বহু-বিবাহ প্রথা ছিল এবং সেই সব নারীদের মধ্যে বিশেষ সদ্ভাব ছিল না তেমনি নারী মনের আরেকটি প্রবণতা অর্থাৎ ওষধি দিয়ে অন্যান্য স্ত্রীদের নীচেরও নীচে নামিয়ে নিজেকে স্বামীর প্রিয়পাত্রী করে তোলার বাসনা ফুটে উঠেছে। নারী-রচিত স্তোত্রগুলি দিয়ে তাহলে ঋকবেদে প্রান্তিক-চেতনাই উঠে এসেছে।প্রকাশ পেয়েছে নারীমনের কথা। অর্থাৎ আর্য-সমাজে পুরুষ একাধিপত্যের ভিত আলগা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটাও তো সামজিক ভাবনার আপডেট।
No comments:
Post a Comment