কবিতার আপডেট – আপডেটেড কবিতা (৩)
মুরারি সিংহ
কবিতার আপডেট প্রসঙ্গে বেদের কথা বলতে গেলে প্রথমে সংক্ষেপে সেই সময়ের কিছু সংবাদ পরিবেশন করা যেতে পারে। বেদের সূক্তগুলি রচিত হয়েছিল কয়েক শতাব্দী জুড়ে সংকলিত হয়েছিল আরো কয়েক শতক পরে। এই সুদীর্ঘ সময় সেগুলি সংরক্ষিত হয়েছিল বংশ ও শিষ্য-পরম্পরায় মুখে মুখে। খুব স্বাভাবিক কারণেই স্তোস্ত্রগুলির অনেক কিছুতেই পরিবর্তন পরিবর্জন সংযোজন ঘটানো হয়েছিল। আবার এই সময়কালে আর্য-সমাজও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল না।সমাজ পরিবর্তনের নিয়মেই তার শরীরেও প্রচুর ভাঙা-গড়া চলেছিল। আর্যরা ছিল বহিরাগত আধা-সভ্য পশুপালক সম্প্রদায় সুদূর মধ্য এশিয়া থেকে গরু-ভেড়া চরাতে চরাতে নতুন চারণভূমির খোঁজে ইউরাল-পর্বত পেরিয়ে ঢুকে পড়েছিল ভারতীয় উপমাদেশে। এদেশে দখল বিস্তারে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল ভূমিপুত্ররা যাদের নাম দেওয়া হয়েছিল অনার্য। কিন্তু সুসভ্য ও উন্নত নাগরিক সভ্যতার অধিকারী সেই ভূমিপুত্রদের ধন-সম্পদ এবং উন্নতি দেখে আর্যদের চোখ কপালে উঠেছিল সম্পদলোভী এবং যুদ্ধবাজ আর্য-সম্প্রদায়গুলি তখন তাদের ঘোড়া ঘোড়ায়-তানা এবং লৌহার তৈরি অস্ত্র দিয়ে অবাধে একের পর এক নগরকে ধ্বংস করেছিল তাদের অধিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা করে ধন-সম্পদ লুঠ করেছিল। আরেকটি জিনিসের উপর আর্যদের নজর পড়েছিল। তা হল এদেশের নারী। আর্য-গোষ্ঠীগুলি ছিল পুরুষ-শাসিত এবং পুরুষ-প্রধান।পথশ্রমের কষ্ট-জনিত কারণে গোষ্ঠীগুলিতে নারীর সংখ্যা কম রাখা হত। তাই অনার্যদের সঙ্গে সংঘাতে তাদের পুরুষদের হত্যা বা বন্দি করে দাস বানালেও আর্যযোদ্ধারা সুন্দরী পুরবাসিনীদের জায়গা দিয়েছিল নিজেদের অন্দরমহলে। এবং সেখানেই এক ভবিষ্যত সমাজ-বিপ্লবের বীজ রোপিত হয়েছিল। আর্য-অনার্য সংকরায়নে যে নতুন প্রজন্মগুলি আসতে শুরু করল সন্তানদের উপর মাতৃপ্রভাবে বৈদিক সমাজে প্রচুর অনার্য উপকরণ হু হু করে ঢুকে পড়ল। পরবর্তী সময়ে রচিত বেদের ঋকগুলিতে তার বিস্তর নমুনা সহজেই খুঁজে নেওয়া যায়।ঋকবেদ-সংহিতায় মোট সূক্তের সংখ্যা ১০১৭, ঋক ১০৪৭২, তাদের সংকলিত করা হয়েছে দশটি মণ্ডলে। মাননীয় পাঠক, তাদের মধ্যে আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছি দশম মণ্ডলের এমন কিছু সূক্তের দিকে যাদের সুর একেবারেই আলাদা এবং যেগুলি দ্বারা প্রমাণিত হয় অন্তিম মণ্ডলে এসে ঋকবেদ-সংহিতা কীভাবে আপডেটেড হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে অবশই বলতে হয় ঋকবেদের দশম মণ্ডলের ৯০ সূক্তের কথা। এটি পণ্ডিত মহলে পুরুষ-সূক্ত নামে পরিচিত।এতদিনের সাকার দেব-দেবী উপাসনা থেকে সরে এসে সেখানে ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী এমন এক পুরুষের কল্পনা করা হল যার শরীরকে আর পৃথিবীর গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা গেল না। সহস্র মাথা, সহস্র চোখ, সহস্র পা লাগিয়ে পৃথিবী ছাপিয়ে তার শরীরকে আরো দশ আঙুল বাড়িয়ে দেওয়া হল।কল্পনা করা হল তারই দেহের অংশ থেকে বিভিন্ন প্রাণির জন্ম হয়েছে। জানিয়ে দেওয়া হল –সেই পুরুষের মুখ হল ব্রাহ্মণ, দু-হাত হল ক্ষত্রিয়, ঊরু হল বৈশ্য এবং দু-পা হল শূদ্র। এমনকি আকাশ-বাতাস-চন্দ্র-সূর্য-অগ্নি-স্বর্গ-মাটি-দিক-ভুবন সবকিছুই সৃষ্ট হল সেই পুরুষের থেকে। এই একটি শ্লোক থেকে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ জানা গেল, প্রথমত বহু-দেবতার ভাবনায় ভাঙন। দ্বিতীয়ত, সমাজে জাতিভেদ প্রথার অস্তিত্ব যেখানে পরাজিত ও বন্দি অনার্যদের শূদ্র নামে অভিহিত করে আর্য-সমাজের নীচের তলায় জায়গা দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত সব কিছুর সৃস্টি এক পুরুষের থেকে অর্থাৎ সমাজে পুরুষরাই প্রধান। মজার কথা তার পাল্টা হিসেবে এর পরেই এল ১২৫ সূক্তটি, যার প্রচলিত নাম দেবীসূক্ত, দেখা গেল সেখানে বাক নামের এক নারী পরমাত্মার জবানিতে নিজেকে ভুবন-নির্মাতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি একবার বললেন আমিই রাজ্যের অধিশ্বরী, পরে বললেন আমিই পিতা। অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার লিঙ্গভেদ ঘুচিয়ে দিলেন। বোঝা গেল কালের কারসাজি কত জমে উঠেছে।
No comments:
Post a Comment