কবিতার আপডেট – আপডেটেড কবিতা (২)
মুরারি সিংহ
মুরারি সিংহ
স্পেনের আলতামিরা গুহা বা তার ছাদে আঁকা বাইসনের কথা আমরা সবাই জানি। বিশেষজ্ঞদের মতে ছবিটি আঁকা হয়েছিল খ্রীস্টপূর্ব ১৬৫০০ থেকে ১৪০০০ অব্দের মাঝামাঝি কোনো সময়ে। আশ্চর্যের বিষয় হল ১৮৮০ সালের দিকে আবিষ্কারটি যখন প্রথম জনগণের সামনে আনা হল তখন তার শিল্পসৌন্দর্যের উৎকর্ষতা দেখে তখন বিংশ শতকের শিক্ষিত মানুষ বিশ্বাস করতে চায়নি যে এই ধরনের বিমূর্ত শিল্পের জন্ম দেবার মতো যথেষ্ট জ্ঞান ও বুদ্ধি প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই গুহাবাসী নিয়নন্ডারথাল মানুষদের ছিল। অনেক গবেষণের পরে পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞরা অবশ্য তার সত্যতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। পাবলো পিকাসো বললেন আলতামিরার পর আর যা কিছু সবই অতিরিক্ত। কবিতার আপডেট প্রসঙ্গে আলতামিরার কথা উল্লেখ করলাম এই কারণে যে অনেকে এখনো মনে করেন কবিতা লেখার জন্যও যথেষ্ট পড়াশোনা ও জ্ঞান-বুদ্ধি থাকা দরকার। এই ধারণা যে কতটা হাস্যকর তার উদাহরণ সম্প্রতি সোশাল-মিডিয়ায় হইচই ফেলে দেওয়া কোসলি ভাষার কবি হলধর নাগ, শিক্ষার দিক দিয়ে যিনি তৃতীয় শ্রেণির গণ্ডি না পেরোলেও কবিতা লেখার জন্য সম্প্রতি পদ্মশ্রী-সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। কেবল রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছেন বলেই নয়, উড়িষ্যার স্থানীয় জনসমাজে তিনি একজন জনপ্রিয় কবি এবং বিদ্যায়তনিক পাঠ্যসূচিতেও তাঁর কবিতা জায়গা করে নিয়েছে এবং সেখানে তাঁর কবিতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু হয়েছে। আমার মনে হয় প্রথাগত শিক্ষা নয় কবিতা লেখার জন্য যা যা দরকার হল তার মধ্যে সবার আগে দরকার একটি সৃষ্টিশীল মন। তার সঙ্গে নিজের চারপাশকে চর্মচক্ষে দেখার পরেও তার বাইরে বেরিয়ে মনশ্চক্ষে দেখার মতো চোখ এবং জীবন ও জগৎ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা। আর যা দরকার তা হল ভাবকে ভাষায় প্রকাশ করার দক্ষতা যা লাগাতার অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। সমাজের উচ্চকোটির মানুষের বৈঠকখানার মধ্যে কবিতা-চর্চাকে কুক্ষিগত করে রাখার যে চল তা ছাপাখানা আবিষ্কার এবং মেকলে-মডেলে পাশ্চাত্যপ্রথায় শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হবার ফল। অবশ্য তার আগে রাজসভা সাহিত্য ছিল। তবুও তার বাইরে গ্রাম বাংলার বিস্তীর্ণ জনপদে আমাদের যে লোকসংস্কৃতির ধারা তার উৎপত্তি ও প্রবাহও তো সেই অক্ষরপরিচয়হীন ও অমার্জিত প্রান্তিক মানুষজনের মুখে মুখেই। চর্যাপদ পদাবলি সাহিত্য মঙ্গলকাব্য সেভাবেই লেখা হয়েছে। এমনকি যে ঋকবেদ সংহিতাকে ভারতবর্ষের প্রাচীনতম রচনা বলে মনে করা হয় তার স্তোস্ত্রগুলি যখন বিরচিত হয় তখন এদেশে উপনিবেশ বিস্তারকারী আর্যদের লিপিজ্ঞান ছিল না। অর্থাৎ সেই আধা-সভ্য বহিরাগতরা ছিল আক্ষরিক অর্থেই নিরক্ষর। স্তোত্রগুলি মুখে মুখে রচিত হত, মনে রাখা হত এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাহিত হত। যে কারণে বেদের আরেক নাম শ্রুতি। আবার এই শুনে শুনে মুখস্ত করতে হত বলে রচনাগুলিকে ছন্দোবদ্ধ করতে হয়েছিল। ঋকবেদ সংহিতায় যদিও কবিতার উপাদান খুব কম। স্তোত্রগুলির ছত্রে ছত্রে শুধু তৎকালীন দখলদারদের কামনা বাসনাই ব্যক্ত হয়েছে। ইন্দ্র অগ্নি মিত্র বরুণ প্রভৃতি দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত বেশির ভাগ রচনাতেই সেখানে কেবল একটা দাও দাও ভাব। প্রথমে দেবতাদের রূপম ও গুণের বর্ণনা এবং শৌর্য-বীর্যের প্রশংসা তারপর ধন দাও বল দাও মান প্রতিপত্তি দাও গাভি দাও নারী দাও আশ্রয় দাও ক্ষমতা দাও, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সব প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য দেবতাদের খুশি করার জন্য যজ্ঞাগ্নিতে নানবিধ হবি ও সোমরস নিবেদন করা হত।আমার তো মনে হয় সেই থেকেই ভারতবর্ষের সমাজে ক্ষমতাবানদের স্তাবকতা করা (স্তুতি থেকেই স্তাবকতা) এবং ঊর্ধ্বতন কর্তাদের উৎকোচ দেবার কুপ্রথাটি চালু হয়েছে। ফরমান জারি করে বলা হয়েছিল বেদের বাণী অলঙ্ঘনীয়, কিন্তু মজার কথা হল, পরবর্তী সময়ে উপনিষদের জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সেইসব বেদবাক্যকেও আপডেটেড হতে হল।
No comments:
Post a Comment