বাজার অর্থনীতি ও একুশ শতকের বাংলা কবিতা ০ মুরারি সিংহ
(দ্বিতীয় পর্ব)
পুঁজিবাদ সম্পর্কে
মোটামুটি একটা ভূমিকা তৈরি করা গেল। এবার কবিতার প্রসঙ্গে আসা যাক। দেখা যাক
পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে এবং কতটা যুক্ত। তবে কবিতার ক্ষেত্রটি যেহেতু ছোটো
নয়, তাই একবিংশ শতকের কবিত-চর্চা এবং তার উপর কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রভাব সম্পর্কে
আলোচনায় ঢোকার আগে বাংলা-কবিতার ইতিবৃত্তটা কিছুটা স্মরণ করা যেতে পারে।
আমরা জানি, বাংলা কবিতার জন্ম এবং পথচলা শুরু হয়েছিল বন-জঙ্গলে ঢাকা দুর্গম বাংলার গ্রামীণ জনপদগুলি
থেকে বৌদ্ধ সিদ্ধাই যোগীদের হাত ধরে প্রান্ত-মানুষের মুখের ভাষায়। তখন শিষ্ট সমাজ
মজে ছিল সংস্কৃত সাহিত্যে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ বদলেছে শাসন বদলেছে কবিতার
সমস্ত কিছুও বদলে গেছে আগাপাশতলা।তার স্রোত বদলেছে, বাঁক বদলেছে, ঝোঁক বদলেছে, মর্জি
বদলেছে। এই হাজার বছরের পথ চলায় বিস্তর পর্ব-উপপর্ব তাকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে। পর্বে
পর্বে তার অর্জনও কিছু কম নয়। খুব সংক্ষেপে তার একটা বিবরণ এখানে পেশ করা যেতে
পারে।
আমাদের সৌভাগ্য
বাংলা-কবিতার সূচনায় রয়ে গেছে পরম সৌগতের ছোঁয়া। কারণ আগেই বলেছি তার জন্ম বৌদ্ধ
সিদ্ধাই-যোগীদের হাতে। যা প্রথম দিন থেকেই ভাবের দিক দিয়ে তাকে দিয়েছে বৈরাগ্য, তান্ত্রিক ও
তাত্ত্বিক রহস্যময়তা, একটা শূন্যতার দর্শন এবং প্রান্তিক-চেতনা। আর আঙ্গিকের দিক থেকে পূর্বতন সংস্কৃত কাব্যের দেখানো আখ্যান-মূলক
বড়ো বড়ো কাব্য-রচনার প্রচেষ্টা বা মেগা-ন্যারেটিভ থেকে সরে এসে শুরুতেই বাংলা
কবিতা মন দিল ছোটো ছোট পদের মাধ্যমে বৃহৎ ভাবকে প্রকাশ করতে। ফলে কবিতায় বহুস্বরিক কণ্ঠস্বরের ভিত্তিভূমি রচিত হল। বাংলা
কবিতার সৌভাগ্যের আরো কারণ হল সেই সময় থেকেই সমাজের সর্ব স্তরের মানুষই তাদের
সাধন-ভজন-উপাসনা ও ঈশ্বর-ভাবনাকে প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন গানকে,
যার ভিত্তিই হল কবিতা।নাচ-গান-হেঁয়ালি-অভিনয়-কথকতা সব মিলিয়ে তা হল গণ-বিনোদনের এক
অসাধারণ প্যাকেজ।
চর্যাপদের পরবর্তী সময়ে বৈষ্ণব পদকর্তাদের হাত ধরে শ্রীকৃষ্ণের
চরিত্র-স্খলন ঘটে গেল। হিংসাকে অতিক্রম করে বাংলা কাব্য-চেতনা পৌঁছে গেল উষ্ণ-প্রেমের
কদমতলায়। গীতায় চিত্রিত কুরুক্ষেত্রের ক্ষাত্র-কৃষ্ণ
রূপান্তরিত হল বৃন্দাবনের প্রেমিক-কৃষ্ণে। শ্রীকৃষ্ণের পরকীয়া নায়িকা শ্রীজাধার
হাত ধরে বাংলা-কবিতায় এল রোম্যান্টিকতা। এই প্রমধর্মই একদিন জাতপাত ও শ্রেণিভেদের
ঊর্ধ্বে উঠে গড়ে তুলল বিশ্বব্যাপি এক অনাবিল মানবপ্রেমের পরিসর।সেই মধ্যযুগেই বৈষ্ণব কবি জানিয়ে দিলেন “সবার উপর মানুষ
সত্য তাহার উপর নাই”।
এতদিনের পালিত
কর্মমার্গ-জ্ঞানমার্গ-ভক্তিমার্গের পথ থেকে সরে এসে ঈশ্বর-সাধনার পথ হিসেবে শ্রীচৈতন্যদেব
বেছে নিয়েছিলেন এই মানবপ্রেমকে। সেই প্রেম প্রকাশের মাধ্যমও ছিল কবিতা।নদের
নিমাইয়ের প্রভাবে বাংলা কবিতা-চর্চায় দীর্ঘদিন ধরে এই প্রেমধর্মের বিস্ফোরণ চলল। পাশাপাশি
মঙ্গলকাব্যের কবিরা সেই মানবপ্রেমের সঙ্গে
মেশালেন মহাকাব্যিক মেজাজ ও দেব-কাহিনিতে নিয়ে এলেন প্রান্তিক-মানুষজনের সুখ-দুঃখ
। মনসা হল হিংসুটি মহিলা। চণ্ডীও আর রণচণ্ডী রইল না। আর বৌদ্ধধর্মের
বুদ্ধ-ধর্ম-সংঘ এই ত্রিরত্নের অগ্র-পশ্চৎ, বুদ্ধ ও সংঘকে আত্মস্যাৎ করে মাঝেরটি সঙ্গে মিশিয়ে অর্থাৎ ধর্ম নিরঞ্জন মূর্তি ধরে হল ধম্ম-ঠাকুর। তার ছায়া পড় মহাদেব বা শিবের
উপর।শিবকে বানানো হল ভিখারি ও চাষা। আরো পরে শাক্ত-পদাবলিতে এল পরম বাৎসল্য ও ভক্তিরস। ভয়াল-ভয়ংকর কালী হল স্নেহশীলা জননী। মায়ে-পোয়ের
ঘরোয়া আলাপচারিতায় দেবীকে সম্বোধন করা হল তুই বলে। আগমনী-বিজয়ার গানে দুর্গা হল
ঘরের মেয়ে উমা বা গৌরী। আবার ওদিকে আরাকান রাজসভার মুসলিম কবিরা কাব্যচর্চায়
দেবতাকে ছেঁটে ফেলে পরিবেশন করলেন নরনারীর প্রেম। আঠারো শতকের শেষে ঔপনিবেশিক পর্ব
তথা ছাপাখানার যুগ শুরুর আগের মুহূর্তে ভারতচন্দ্র বালা কবিতাকে উপহার দিয়ে গেলেন নাগরিক
বিচক্ষণতা ও বৈদগ্ধ। এই প্রাচীন ও মধ্যযুগে
বাংলা-কবিতার প্রধান বৌশিষ্ট্য হল তাকে দিয়ে তখন বাহনের কাজ করানো হয়েছে। তখন কাব্য ও গান ছিল একান্নবর্তী।
গাথা-কথকতা-কাব্য আবৃত্তির ভিতর ছিল লোকায়তিক সম্বোধন, রসগ্রাহিতা, লোকসেবার
মনোভাব।তবে দেব-দেবী নির্ভর হলেও এইসব
কবিতার
মধ্যে ফুটে উঠেছে নানান অর্থনৌতিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয়-সামাজিক পটপরিবর্তন ও পালাবদলের
দাগ। সেই প্রবাহের মধ্যেই
ধরা আছে কবিতার ভাব-বদল ভাষা-বদল মেজাজ ও মর্জি বদলের নানান চিহ্ন-প্রকরণ।
উনবিংশ শতকে এসে এই প্রবাহে যুক্ত হল কেরি-মার্শম্যানের শ্রীরামপুর
মিশন ও প্রেস, পঞ্চানন কর্মকারের তৈরি বাংলা হরফ এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। তার থেকে
বাংলা গদ্যের পথচলা শুরু। কাব্যরস চর্চা ও আস্বাদন থেকে বিরত থেকে গৌড়জন কিছুদিন
গদ্যের মাধ্যমে জ্ঞান-চর্চায় মগ্ন রইল। বিদ্যাসাগর, রামমোহন,দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার
দত্ত, রাজনারায়ণ বসু, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রাজেন্দ্রলাল মিত্র
এইসব স্বনামধন্য মনীষীরা প্রচুর দরকারী গদ্য লিখলেন। এদেরই মাঝখানে সংবাদ-প্রভাকর হাতে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র
গুপ্ত।বাংলা কবিতায় শুরু হল এক নতুন যুগ। তবে মধ্যযুগ ও নব্য-যুগের মাঝে পাখায়
ক্ষণকালের ছন্দ নিয়ে পতঙ্গের মতো এসেছিলেন কবিওয়ালারা। তাদের স্বভাব-কবিত্ব, চটকদার
কথা, রঙ্গ-কৌতূক ও সুরের লড়াইয়ে খানিক মজে রইলেন বাংলার নব্য-বাবুরা। সেখানে রয়ে
গেল পুরোন ধর্মকথার জের টেনে লালিত্য ও চটুলতার সমাবেশ। বাক-চাতুরি। মিলের চমক।
তালের কায়দা। স্থূল অলঙ্কার
প্রয়োগ। প্রসঙ্গের গতানুগতিকা এবং খানিকটা হলেও রস-চেতনা।
আসরগুলিতে খিস্তি-খেউরের স্রোতও বয়ে গেল বেদম যদিও তারা হালে ইংরেজি শেখা শিক্ষিত
যুবকদের মনে যথার্থ উদ্দীপনা যোগাতে ব্যর্থ হল।তবে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর সংবাদ-প্রভাকরের
পাদ পূরণের জন্যে জন্ম দিলেন পদ্যের। সেখানে গুপ্ত-কবির কলমে অবাধে চলল ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ-রঙ্গ-রসিকতা।
ঈশ্বরগুপ্তের কবিতার মতো রামণিধিগুপ্তের (নিধুবাবু) গানেও লৌকিক জীবনের প্রতি
মনযোগ দেখা গেল। তারপর এল ইংরেজি ছাঁচে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক কবিতা। একক কবির
আধিপত্য। রোম্যান্টিক ভাববিলাস।সেই সময়ে মধুসূদন এক নতুন ছন্দে নতুন করে লিখলেন
মহাকাব্য। লিখলেন বাংলা সনেট। তাঁর কবিতায় বাইরের উপকরণ বা
বহিরাঙ্গের কৌশলের সঙ্গে মিশে গেল ভাবের স্বাধীন গতি। তাঁকে অনুসরণ করে হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র
জন্ম দিলেন আরো আখ্যান-কাব্য। রঙ্গলাল আনলেন দেশপ্রেম। বিহারিলাল ‘ভোরের কোকিল’
হয়ে শোনালেন গীতি-কবিতার সুর। তারপর তো সুমহান রবীন্দ্র যুগের সূচনা। কবিতায় ও
গানে অবিরল অতীন্দ্রীয়তা নিয়ে বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব এক প্রকাণ্ড
মহীরুহের মতো। অসাধারণ বাকসংযম, ভাবসংযম, ভাবগম্ভীরতা ও ঋজুতা, স্বয়ং-সম্পূর্ণতা,
আলংকারিকতা, ছন্দ ও মিলের ঘনত্ব এবং সবার উপরে অভিব্যক্তির নতুন নতুন ভঙ্গিমা। সব
মিলিয়ে রবীন্দ্র-প্রভাব ছড়িয়ে গেল বাংলা কবিতার সর্বাঙ্গ জুড়ে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নতুন বিশ্ববীক্ষার আলোয় সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে আস্তিক্য-বুদ্ধি, সত্যনিষ্ঠা, সৌন্দর্যবোধ, আনন্দ-মঙ্গল-কল্যাণ-প্রেম এইসব মিলিয়ে তিল
তিল করে গড়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথের ভাবনালোক
বিশ শতকের নতুন প্রজন্মের মনঃপুত হল
না। রবি-কিরণের প্রকোপে হাঁসফাঁস করা অস্তিত্বের সংকটে-ভোগা কবি-যশঃপ্রার্থী তরুণ-তুর্কিরা রবীন্দ্রনাথের
মাঙ্গলিক দেবায়তন থেকে সজোরে বেরিয়ে এসে খুঁজলেন পরিত্রানের অন্যপথ।
রবীন্দ্র-সমসাময়িক
কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের আদর্শকে সামনে রেখে রবীন্দ্র-বৃত্তের ভিতরে থেকে যাঁরা
কবিতা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় জাগ্রত জগৎকে সক্রিয় সতর্ক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে ক্লান্ত ও অবসন্ন
মনে কিছু অলস স্বপ্নমাধুরী উপভোগ। যতীন্দ্রমোহন বাগচির স্বপ্নবলাসী মনেরূপসম্ভোগের
তৃষ্ণা, কালিদাস রায়। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের শব্দ, ছন্দ ও তথ্যের উপাদানে কিছু
নতুনত্ব আনলেন। সংসারের বিরোধ ও বিক্ষোভের দিকে না তাকিয়ে আত্মকালবিস্মৃত
বৈষ্ণবভাবময় কুমুদরঞ্জনের ছিল দায়হীন সহজিয়া বাউলপন্থা ও পল্লীপ্রীতি। আবার কিছুটা ব্যাকরণ-ঘেঁষা কালিদাস রায়ের ছিল শিক্ষিত
স্বভাব-কবির মানস। তার মধ্যেও অবশ্য সহজ বৈষ্ণব-ভাবের অভাব ছিল না।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথকে
স্বীকার করেও যাঁরা কিছুটা ভিন্ন সুর আনার চেষ্টা করলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখ করতে
হয় মোহিতলালের নির্ভয় দেহাত্ম তথা ভোগবাদ ও ভোগবৈকল্য সম্বন্ধে অনুশোচনা, প্রমথ
চৌধুরীর বুদ্ধিনিষ্ঠা এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর যতীন্দ্রনাথের মরুচৈতন্য ও সরল বৈঠকী
দুঃখবাদ বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় যা আটপৌরে, এবড়ো-খেবড়ো মাঠের উপর দিয়ে চৈত্র মাসের
শুকনো হাওয়ার মধ্যে খুব করে গোরুর গাড়ি চালিয়ে নেবার মতো সুর। যতীন্দ্রনাথই বাংলা
কবিতায় মরুভূমির আমদানি করে এক নতুনত্বের প্রয়াস দেখালেন। তাঁর তিনটি
কাব্যগ্রন্থের নাম – মরীচিকা-মরুশিখা-মরুমায়া। তিনি বেশ তির্যক চাউনির কবি। তাঁর কবিতায় এল অনেক নৈরাশ্য-বেদনা-বিফলতা-খেদ-পরিতাপ-ব্যঙ্গ-বিষণ্ণতা। তিনিই
শীতকালের সঙ্গে জুড়ে দিলেন মৃত্যুর প্রসঙ্গ। আর বাংলা কবিতায় বিপ্লবের নিশান উড়িয়ে
যাঁর আবির্ভাব কবিগুরু জনপ্রিয়তাকে পর্যন্ত টলিয়ে দিয়েছিল,নতুন যৌবনকে যিনি
সৃষ্টি-সুখের উল্লসিত ভাষা দিয়ে প্রাণ-চ্ঞচলতায় ভরিয়ে দিলেন, তিনি এক ও অদ্বিতীয় নজরুল
ইসলাম।
No comments:
Post a Comment