Friday, May 13, 2016

অথ পরকীয়া বেতান্ত ০ মুরারি সিংহ

অথ পরকীয়া বেতান্ত ০ মুরারি সিংহ


কোনো কিছু নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তার একটা শুরু থাকে। পরকীয়া নিয়ে এই আলোচনায় তার শব্দার্থ দিয়েই শুরু করা যাক। বড় বড়ো অভিধান ঘেঁটে জানা গেল পরকীয়া শব্দটি আসলে স্ত্রীলিঙ্গ। আর পুংলিঙ্গ হল পরকীয়, যার অর্থ পরসম্বন্ধীয় বা অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। কী আশ্চর্য, দেখা যাচ্ছে স্ত্রীলিঙ্গে এসে শব্দটির মানে একেবারেই বদলে গেছে। তখন পরকীয়ার অর্থ দাঁড়িয়েছে নায়িকাবিশেষ। ‘’স্বীয়া পরকীয়া আর সা্মান্য বনিতা। অগ্রে এই তিন ভেদ পণ্ডিত বর্ণিতা।।’’ - ভারতচন্দ্র তাঁর ‘রসমঞ্জরী’-তে এমনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘বিশ্বকোষ’ গ্রন্থে লিখছেন – “গুপ্তভাবে যাহার পরপুরুষের প্রতি অনুরাগ, তাহাকে পরকীয়া কহে”।ভারতচন্দ্রও বললেন- “অপ্রকাশে যার মতি পর পতি সনে। পরকীয়া তাহারে বলয়ে কবি গণে।।উঢ়া আর অনুঢ়া বিভেদ হয় তার। উঢ়া সেই বিবাহ হইয়া থাকে যার।। অনুঢ়া সে জন যার হয় নাহি বিহা। পিত্রাদি অধীন হেতু সেও পরকীয়া।।” এরপর অবশ্য সেখানে পরকীয়া-নায়িকার আরো অনেক প্রকার ভেদের বর্ণনা করা হয়েছে। আপাতত সেই বিস্তারে যাচ্ছি না। মোদ্দা কথাটা হল বিবাহিত নারীর গায়ে পরপুরুষের গন্ধ লেগে গেলেই তার গোত্র বদল হয়ে যায়। তখন সে আর নারী থাকে না। হয়ে যায় নায়িকা। পরকীয়া নায়িকা। মজাটা বুঝুন, এখানেও যত দোষ নারীর, বিবাহিত পুরুষদের সাত পরনারী মাপ। এখন দেখা যাক পরকীয়ার শুরুটা কোথায়। আমাদের জানা ছিল পরকীয়া মানে কেষ্ট ঠাকুর আর শ্রীরাধা। এখন বোঝা গেল না, শ্রীরাধা একাই এই কলঙ্কের ভাগীদার। কৃষ্ণের কাজ শুধু বাঁশি বাজানো। তবে রাধাই হোক অথবা কৃষ্ণ দুজনেই কিন্তু ধর্মীয় চরিত্র। আমাদের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত বেদে রাধা বা কৃষ্ণ দুজনের কারোরই নামগন্ধ ছিল না। বিবাহ প্রথা থাকলেও, নারী-পুরুষের সম্বন্ধ বেশ শিথিল ছিল, কারণ আর্যগোষ্ঠীগুলি যখন ভারতবর্ষে পা রেখেছিল তখন সেখানে নারীর সংখ্যা যথেষ্ট কম ছিল। এলাকা দখলের লড়াইয়ে এদেশের ভূমিপুত্রদের নিবির্চারে হত্যা করলেও অনার্য নারীদের তারা অপহরণ করে নিয়ে এসে অন্দরমহলে ঠাঁই দিয়েছিল। ফলে তাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলির মধ্যে বর্ণসংকরের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে চলল। আর্য-সমাজও ভাঙতে শুরু করল। শাস্ত্রকারেরা তখন অনুলোম-প্রতিলোম বিবাহের বিধান দিলেন, বর্ণসংকর-জাতকদের জাত নির্দেশ করলেন, কাজও ভাগ করে দিলেন। সে যাই হোক। প্রথম মহাকাব্যেও রাধা-কৃষ্ণ অনুপস্থিত। তবে তখন সতীত্বের ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। যদিও আশ্চর্যের বিষয়, রামায়ণের নায়িকা সীতাকে সতী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সতীত্বের প্রমাণ দিতে সেই নায়িকাকেও বার বার মুখোমুখি হতে হয়েছে অগ্নি-পরীক্ষার। রাম তো তার চরিত্র নিয়ে রীতিমতো সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। যার ফলশ্রুতি প্রথমে সীতার বনবাস এবং শেষপর্বে এসে পাতালপ্রবেশ। পরবর্তী সময়ের শাস্ত্রকাররাও কিন্তু পঞ্চসতী যে তালিকা বানালেন সেখানে জনকনন্দিনীকে ঠাঁই দিলেন না। অথচ যাদের রাখলেন সেই অহল্যা-দ্রোপদী-কুন্তী-তারা-মন্দোদরী, পুরুষ-সঙ্গের ব্যাপারে কিন্তু তাদের সবারই ঠিকুজি-কুষ্ঠী বড়ো গোলমেলে। সেখানেও কালির ছিটে খুব একটা কম নেই। তার মানে শাস্ত্রকারদেরও মতিগতি বোঝা ভার। দ্বিতীয় মহাকাব্যে রাধারানী গরহাজির থাকলেও দেখা যাচ্ছে দশদিক কাঁপিয়ে কেষ্ট ঠাকুর কিন্তু মঞ্চে হাজির হয়েছে। এবং পুরোদস্তুর নিজের প্রতাপ জাহির করছেন। তখন অবশ্য তার গায়ে স্বকীয়া ছাড়া অন্য কোনো গন্ধ ছিল না। তখন তার যোদ্ধার বেশ। তিনি তখন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণ। তার চতুর্ভুজ রূপ। প্রথম হাতে শঙ্খ যার নাম পাঞ্চজন্য। অন্য দু-হাতে সুদর্শনচক্র আর গদা। আরেক হাতে পদ্ম। যদিও সেখানে চক্র এবং গদার ভূমিকাই প্রধান। কারণ কুরু-পাণ্ডবের দ্বৈরথে কৃষ্ণের আগ্রহ যুদ্ধ থামানোর চেয়ে যুদ্ধ-লাগানোর দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েছে। সেই যদুপতি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কী কাণ্ডটাই না ঘটালো। ন্যায়যুদ্ধের নামে অজস্র অন্যায়ের ভূমিকা রচনা করল। হানাহানিতে অনিচ্ছুক বেচারা অর্জুনকে ভোকাল-টনিক দিয়ে গাণ্ডীব ধারণ করতে বাধ্য করল। যুদ্ধের সপক্ষে তার মুখনিঃসৃত বাণী নিয়ে একটা ধর্মগ্রন্থ লেখা হল। আবার নিজে যুদ্ধ করব না বলেও ছল-চাতুরিতে পরিপূর্ণ একজন ধুরন্ধর রাজনীতিবিদের মতো পাণ্ডবদের নানা পরামর্শ দিয়ে গেল, আঠারো দিন ধরে পাণ্ডবদের পক্ষ নিয়ে নেপথ্য থেকে সমস্ত যুদ্ধটাই পরিচালনা করল। আবার পরবর্তী পর্বে নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে তার সাধের যদুকুল যখন ধ্বংস হচ্ছে তখন দেখা গেল তা রোধ করার মতো শক্তি যদুকুল অধিপতির শরীরে আর অবশিষ্ট নেই। এরপর সময় বদলাল। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে কৃষ্ণ-চরিত্রটিকেও আপডেটেড হতে গেল। ভগবত-পুরাণে দেখা গেল ভারতভূমিতে ভক্তির জোয়ার এসেছে। আর বাকি সব দেবদেবীর মহিমা ম্লান করে কেষ্ট-ঠাকুর হয়ে গেছে ভক্তের ভগবান। তার সঙ্গে যুক্ত হল ব্রজলীলা। যেখানে শ্রীকৃষ্ণ বালগোপাল হয়ে একদিকে মা-যশোদার সঙ্গে দুষ্টুমি করছে অন্যদিকে রসিক-কৃষ্ণ হয়ে ব্রজনারীদের সঙ্গে কেলি করছে। যদিও পুরাণকাররা খুব কৌশলে কৃষ্ণের বয়স রাখলেন আট বছর। অর্থাৎ ভাবটা এই রকম কৃষ্ণ নেহাতই একজন দুধে-দাঁত ভাঙা বালক, সুতরাং পাবলিক যেন তার সখি-সঙ্গের অন্য মানে না করে কারণ তখনো যার যৌন-চেতনার কুঁড়ি ফোটেনি।বরং সেখানে বাল্যলীলার প্রাধান্যই বেশি করে দেখে। তবুও মহাভারত-হরিবংশ-বিষ্ণুপুরাণের মতো ভাগবতে রাধাকে পাওয়া গেল না। কিন্তু পরবর্তীপর্বে গোলটা বাধালো এই রাঢ়বঙ্গেরই ভাত-মাছ খাওয়া এক বাঙালি কবি। পৌরাণিক যুগ পেরিয়ে এসে মধ্যযুগে তিনি কৃষ্ণের সঙ্গে জুড়ে দিলেন রাধাকে আর তাদের নিয়ে লিখে ফেললেন আস্ত একটা কেচ্ছা-কাব্য। এর আগে দক্ষিণভারতের লোকসাহিত্যে রাধা নামের ছিঁটে-ফোঁটা উল্লেখ থাকলেও তাকে কেষ্ট-ঠাকুরের নায়িকা বানিয়ে কাব্য রচনার সম্পূর্ণ কৃতিত্ত্ব কিন্তু কেঁদুলির কবি জয়দেব গোস্বামীর। ললিতলবঙ্গলতা-শব্দবন্ধের জনকে কলমে ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্য হিসেবে এক অসামান্য সৃষ্টি। যেমন তার ভাব, তেমনি ভাষা। কিন্তু মুশকিলটা হল সেখানে যার সঙ্গে শ্রীমান কৃষ্ণ লীলা করছেন সেই শ্রীরাধা কৃষ্ণের স্ত্রী নয়। আর কবি বলে দিলেন -‘ধীরসমীরে যমুনাতীরে বসতি বনে বনমালী। / পীনপয়োধরপরিসরমর্দনচঞ্চলকরযুগশালী।।” সুতরাং প্রেম আর বৈধ রইল না। নিতম্ববতী গোপবধূদের পীনপয়োধর ভারে নিপীড়িত এবং কামের আগুনে জরজর পীতবসন-পরিহিত শ্রীমধুসূদন যমুনার তীরে শ্রীরাধার দাঁতের দংশনে আহত, নখের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হতে হতে ডুব দিলেন দেহবিলাসে। ফলে সমাজকর্তারা পড়লেন মহা ফাঁপরে। ‘দেহি পদ-পল্লবমুদারম’ বা ‘রতিসুখসারে’ তাদের অসাধারণ কথা-সুর ও কাব্যরসের গুণে এতটাই জনপ্রিয় হল যে তাকে অস্বীকার বা নাকচ করা যায় না, আবার অন্যের বিয়ে করা বউয়েদের সঙ্গে সর্বজন পুজিত এক দেবতার বৃন্দাবনের কুঞ্জবনে এমন খোলাখুলি শৃঙ্গাররসের বান ডাকানো সেটাও হজম করা কঠিন। সুতরাং সাততাড়াতাড়ি খুব কৌশল করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা হল। শাস্ত্রকারদের দিয়ে লেখানো হল নতুন এক পুরানকথা। সব জটিলতা নাশ করার জন্যে ষষ্ঠী-মনসার কথা-অলা্ হাল-আমলের ব্রহ্মবৈবর্তব্যপুরাণে রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের বিয়ে দেওয়া হল এবং সেই বিয়েতে পৌরোহিত্য করার জন্য টেনে নামানো হল স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে। এত করেও শেষ রক্ষা হল না। শৃঙ্গার রসের সেই স্রোতকে আটকাতে প্রতিষ্ঠানবাদীদের এই সাবধানী বাঁধ-বাঁধার চেষ্টা কোন কাজেই লাগলো না। মুসলিম শাসনকালে বঙ্গভূমিতে বৈষ্ণব প্রেমের এক প্লাবন দেখা দিল। ভেসে গেল রক্ষণশীলতার সমস্ত প্রতিরোধ। গীতগোবিন্দের ভাষা সংস্কৃত। যদিও তা নানা জায়-খোয়ানো লোকজ উপাদানে ভরপুর। ‘আহ্মে’ ‘তোহ্মে’ মার্কা প্রাচীন বাংলাভাষায় বৈষ্ণব পদ লেখার শুরুটা করলেন রাঢ়বঙ্গের আরেক কবি বড়ু-চণ্ডীদাস। বাসুলির এই উপাসক মূলত শক্তিসাধক হলেও একটা সময়ে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমরসে মজে লিখলেন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’। সেখানে দেখা গেল শ্রীকৃষ্ণ ক্রমাগত কু-প্রস্তাব দিতে দিতে একসময় বনের মধ্যে রাধাকে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করছে। লোকজানাজানির ভয়ে রাধাকে বলতে হচ্ছে-“আতিশয় না চাপিহ আধর দাঁতে।/সখি সন দেখিআঁ বুলিব দন্তাঘাতে।।/নখঘাত না দিহ মোর পয়োভারে।/আইহন দেখিলেঁ মোর নাহিক নিস্তারে”। বড়ু চণ্ডীদাস আবার রাধার স্বামীর নাম যে আইহন তাও জানিয়ে দিলেন এবং কৃষ্ণকে চিত্রিয় করলেন এক কামুক-পুরুষ রূ্পে। এরপর ঘটে গেল সেই সমাজবিপ্লব। এ-পাড়া ও-পাড়া মাতিয়ে প্রেমধর্মের প্রচারে খোল-করতাল নিয়ে রাস্তায় নামলেন নদের নিমাই শ্রীচৈতন্যদেব। জয়দেব তবু গীতগোবিন্দের শুরুতে নন্দের মাধ্যমে দিয়ে রাধাকে কৃষ্ণের হাতে সমর্পণ করে বোঝাতে চেয়েছিলেন রাধা-কৃষ্ণের প্রেমে অনৈতিক বা অবৈধ কিছু নেই। কিন্তু শ্রীচৈতন্য কোনো রাখঢাক করলেন না। তিনি সরাসরি ঘোষণা করে দিলেন রাধা সর্বোতভাবে পরকীয়া নায়িকা। তিনি শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী-শক্তি অর্থাৎ কিনা একজিকিউটিভ ফোর্স। তার শৃঙ্গাররসের সাক্ষাত প্রতিমূর্তি। ফ্রয়েড-সাহেবের লিবিডো-তত্ত্বের বহুযুগ আগেই বঙ্গভূমিতে শৃঙ্গাররস নিয়ে এমন সব বিস্ফোরক কাণ্ড ঘটে গেল। অন্যান্য বৈষ্ণব-সম্প্রাদায়ের মতো বৈধী-ভক্তির পথে না হেঁটে ভারতীয় ধর্ম-ভাবনায় পেরেস্ত্রৈকা নিয়ে আসা শচিনন্দন মগ্ন হলেন রাগানুগা-ভক্তিতে। সতীত্বের ক্যানন ভেঙে সেই ভাঙা-টুকরো দিয়ে শ্রীচৈতন্যদেব তৈরি করলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব-ধর্ম। শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-তে জানিয়ে দিলেন স্বকীয়া এবং পরকীয়া দু-ধরণের শৃঙ্গাররসই ‘মধুররস’ এবং ‘সব রস হৈতে শৃঙ্গারে অধিক মাধুরী’। তিনি রাধাকে বললেন শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়-বিকার। চৈতন্য জীবনীকার হয়েও ব্রাহ্মণ্য-সমাজে লালিত-পালিত এই সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত অবশ্য সেই সঙ্গে একথাও জানিয়ে দিতে ভুললেন না ‘পরকীয়াভাবে অতি রসের উল্লাস। / ব্রজ বিণা ইহার অন্যত্র নাহি বাস।’ বাঙালিজাতিটারই অবশ্য জন্ম লগ্ন থেকেই একটা কেমন কেমন ভাব। বাৎস্যায়ন তার কামসূত্র এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে গৌড়দেশের রাজুন্তঃপুরে যে-সব মহিলা থাকেন তারা লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে ব্রাহ্মণ-রাজকর্মচারী এবং দাসভৃত্যদের সঙ্গে কামচর্চা, কামষড়যন্ত্র ও কামসম্ভোগে লিপ্ত হন। চর্যাপদে তো জনপদের প্রান্তসীমায় বসবাস করা নিচু জাতির মহিলাদের সঙ্গে ব্রাহ্মণ-কাপালিকদের ফষ্টি-নষ্টির কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তারপর গীতগোবিন্দ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এবং মহাজন পদকর্তাদের অজস্র বৈষ্ণবপদ। সেখানে কেষ্ট-ঠাকুরের ভূমিকা ক্রমশ ফিকে হয়ে গেল। প্রধান হয়ে উঠল শ্রীরাধার কাম-অভিসার। মাঝরাত। ঝমঝম বৃষ্টি। পিছল রাস্তাঘাট। বৃন্দাবনের কুঞ্জবনগুলিতে ঘনঘোর অন্ধকার। এই অবস্থায় রাধারানী চলেছেন শ্যাম গুণমণির সঙ্গে মিলিত হতে। তাকে অনুসরণ করছেন বঙ্গভূমির পরম রোম্যান্টিক বৈষ্ণব-কবিরা। কামার্ত রাধার হয়ে বৈষ্ণবকবি বললেন- “রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।/ প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।।” চণ্ডীদাসের রাধাকে বলতে শোনা গেল –“কলঙ্কী বলিয়া ডাকে সব লোকে তাহাতে নাহিক দুখ।/ তোমার লাগিয়া কলঙ্কের হার গলায় পরিতে সুখ।।” কিংবা –“সই ছাড়িতে নারিব কালা / কুল তেয়াগিয়া ধরম ছাড়িয়া লভি কলঙ্কের ডালা।।” আর রাধার এই কলঙ্ক হয়ে উঠল বাংলার মহাজনপদকর্তাদের একান্ত আদরের ধন। এইভাবে মধ্যযুগেই সাবালক হয়ে উঠল বাংলা কবিতা। বৈষ্ণব-কবিরা রাধাকে যেমন শারীরিক ভাবে গড়ে তুললেন সেই সঙ্গে শ্রীরাধার পরকীয়া এবং কলঙ্ককে মুড়ে দিলেন ধরি-মাছ না-ছুঁই পানি গোছের চরম হেঁয়ালি ও রহস্যময়তায়। চণ্ডীদাস বললেন –“ধনি কহব তোমার ঠাঞি।/পরকীয়া রস করিতে হে বশ অধিক চাতুরি চাঞি।।/যাইবি দক্ষিণে থাকিবি পশ্চিমে বলবি পুরব মুখে।/ গোপন পিরিতি গোপন রাখিবি থাকিবি মনের সুখে।।/গোপন পিরিতি গোপন রাখিবি সাধিবি মনের কাজ।/ সাপের মুখেতে ভেকেরে নাচাবি তবে তো রসিক রাজ।।” কিংবা - “কলঙ্ক সাগরে সিনান করিবি এলাইয়া মাথার কেশ।/নীরে না ভিজিবি জল না ছুঁইবি সম সুখ দুখ ক্লেশ।।/ কহে চণ্ডীদাসে বাসুলী আদেশে বাশুলি চরণে পড়ি।/ হইবি গিন্নী ব্যঞ্জন বাঁটিবি না ছুঁইবি হাঁড়ি।।” আমরা জানি ব্রাহ্মণ-সন্তান চণ্ডীদাস রজকিনি রামীর সঙ্গে প্রেমে মজেছিলেন, সেখানে নিজের প্রেম থেকেও কামকে আলাদা রাখতে গিয়ে আরেকটি পদে তিনি বলেছেন – “রজকিনি প্রেম কিশোরীস্বরূপ কামগন্ধ নাহি তায়,/ রজকিনি প্রেম নিকষিত হেম বড়ু চণ্ডীদাস গায়।।” বৈষ্ণবপদাবলির সার বোঝাতে আরেকটি পদের উল্লেখই যথেষ্ট –“পিরিতী নগরে বসতি করিব, পিরীতে বাঁধিব ঘর।/ পিরীতি দেখিয়া পড়শি করিব, তা বিনু সকলি পর।।” এইভাবে মধ্যযুগে বাংলা কবিতার বাড়-বাড়ন্ত ঘটিয়ে এক পরম ঐশ্বর্য তৈরি করেছিল রাধাকৃষ্ণের প্রেম বা বৈষ্ণব পদাবলি। দীর্ঘসময় ধরে রসসসাহিত্যের এক তীব্র ভূমিকম্পের ভিতর দিয়ে বাঙলা-সাহিত্য একটা মহা ঘোরের মধ্যে পথ হেঁটে এল। তার সঙ্গে যুক্ত হল কোচ-রমণীর প্রতি শিবঠকুরের আসক্তি। ভাবুন, তাণ্ডব-নৃত্যকারী অমন যে প্রলয়ের দেবতা বাঙালির হাতে তারও কী হাল হয়েছে। তাকে বুড়ো বানিয়ে লাঙল-কাঁধে জমি চাষ করিয়েছে। শুধু তাই নয় তারপর তাকে ভিখিরিও সাজিয়েছে। শৃঙ্গাররসের এই রমরমা শেষপর্বে এসে বিদ্যাসুন্দরের সুড়ঙ্গ-প্রেমে পরিণত হয়েছে। সেখানে চোরের মতো সিঁদ-কেটে এসে সুন্দর দিনেরবেলায় ঘুমন্ত রাজকন্যার সঙ্গে রতিরঙ্গ করেছে এবং ক্রমাগত দেহমিলনের ফলে সেই কুমারীর গর্ভসঞ্চার হয়েছে। যদিও দেবদেবীর খেলা বলে এসবকিছুর ওপরেই ধর্মের একটা মোড়ক লাগানো আছে। তবু ভারতবর্ষের অন্য কোনো ভাষায় পরম উপাস্য দেবদেবীদের নিয়ে এতটা হাসি-ঠাট্টা-রঙ্গ-তামাশা করা হয়নি। সুতরাং এসব দেখেশুনে বলতেই হচ্ছে সত্য সেলুকস কী বিচিত্র এই বাঙালিচরিত্র!পাতে মাছের গন্ধ না পেলে তার মন বৈরাগী হব হব করে, অথচ ইলিশ-কাতলার কথা ‘ব্যাদে নাই’। আবার কয়েকজন বাবু এক জায়গায় জড়ো হলেই যেটা অনিবার্য তার নাম পরচর্চা। সেখানেও দেখো, কোনো রকম আঁশটে গন্ধ পেলে আর দেখতে হবে না, আড়ালে-আবডালে সবার প্রাণই ছুঁক ঝুঁক করে উঠবে। তখন সেটা পরচর্চা থেকে পরচচ্চড়ি হতে বেশি সময় লাগে না। বাঙালি বাবুদের মুখে হরি হরি আর বাগানবাড়িতে শ্রীরাধা। আহা, মনে মনে সবাই যেন কলির কেষ্ট হতে চায়। বাঙালির বাবু-পর্ব মানে উনবিংশ শতকের ব্রিটিশ-বাংলা। বাংলা-সাহিত্য জুড়ে তখনো ভারতচন্দ্রের রেশ ম ম করছে। বঙ্গদর্শনেও একসময় লেখা হল – “অশ্লীলতা, বঙ্গদেশিয়দের জাতীয় দোষ বলিলে অত্যগক্তি হয় না। যাঁহারা ইহা অত্যুক্তি বিবেচনা করিবেন তাঁহারা বাঙালির রহস্য, বাঙালির গালি, নিম্নশ্রেণির বাঙালি স্ত্রীলোকের কোন্দল, এবং বাঙালির যাত্রা, কবি পাঁচালি মনে ভাবিয়া দেখুন। মুহূর্তের জন্য বাঙালি কৃষকের কথোপকথন শ্রবণ করিয়া দেখুন – বাঙালি প্রণীত যে সকল কাব্য গ্রন্থ সর্বোৎকৃষ্ট বলিয়া খ্যাত তাহা পাঠ করিয়ে দেখুন। বাঙালির চরিত্রে অশ্লীলতার ন্যায় কোনো দোষই সর্বব্যাপী নয়।” একথা স্পষ্ট, পরকীয়ার সঙ্গে অশ্লীলতার একটা ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে। ব্রিটিশ-কলোনির অধিবাসী হয়ে ইংরেজি-শিক্ষার সঙ্গে নব্য-শিক্ষিত বাঙালি আরেকটি জিনিসকেও আত্মস্থ করেছিল যার নাম ভিকটোরিয় মর্যা্লিটি। সুনীতি নামক সেই জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে তাঁদের অনেকেই নিজেরা অকালে জ্ঞানবৃদ্ধ হয়ে যেমন পিয়ানোর পায়ে ঢাকনা লাগানোর পক্ষপাতী ছিলেন, তেমনি নিজেদের মধ্যযুগীয় সাহিত্যকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করে তাদের সর্বাংশে বর্জন করতে চেয়েছিলেন। বিংশ শতকে বাংলায় অনুদিত মেঘদূতের ভূমিকা লিখতে গিয়ে বুদ্ধদেব বসু গীতগোবিন্দের প্রসঙ্গ টেনে এনে মন্তব্য করলেন তা “আদিরসের মরচে-পড়া মুখস্থ-করা বুলি।” কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এক রকম অশ্রদ্ধা থেকেই প্রাচীন বাংলা-সাহিত্যকে বলেছিলেন ‘সাধারণত অপাঠ্য’। তাঁর মতে সেসবের মধ্যে আছে, ‘কল্পনার শোচনীয় অভাব’, ‘কুসংস্কার ও নির্বন্ধাতিশয্য’, ‘নির্লজ্জ নাগরালি’, ‘বারমাস্যার বাগবাহুল্য’ – এইসব। নেহাত খাজুরাহো-কোনার্কের মন্দির-ভাস্কর্যকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি এই যা। অথচ আমরা জানি যিনি যৌনতা নিয়ে ভিকটোরীয় নীতিবোধে লালিত এবং রবীন্দ্র-পরিমণ্ডলে পালিত যৌনতা বিষয়ক ট্যাবুকে ভাঙতে চেয়েছিলেন দেহজ কামনায় জর্জতিত হয়ে সেই বুদ্ধদেব বসু নিজের কবিতায় অনায়াসে লিখতে পেরেছিলেন-‘রমণী-রমণ রণে পরাজয় ভিক্ষা মাগি নিতি।’ তার গল্প-উপন্যাসও অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল। আবার ঔপনিবেশিক-পর্বের শুরুতে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও বঙ্কিমচন্দ্র বৈষ্ণব পদাবলি সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাবই পোষন করেছিলেন। বঙ্গদর্শনে তিনি বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জয়দেব, শ্রীচৈতন্য সম্পর্কে বেশ কিছু লেখা প্রকাশ করেছিলেন। গীতগোবিন্দ-তে যে রস পরিবেশন করা হয়েছে বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন তার নাম দিয়েছে বিলাসরস। যদিও বঙ্কিম কৃষ্ণচরিত্র নির্মাণে অর্বাচীন ব্রহ্মবৈবর্ত-পুরাণকেই অনুসরণ করেছেন। এবং কৃষ্ণ সম্পর্কে চৌরবাদ ও পরবাদের প্রবাকে অমূলক ও অলীক বলে বর্জন করেছেন। গীতগোবিন্দ নিয়ে বঙ্গদর্শনের যে মত তা এই রকম, জয়দেব যে সময়ে লিখেছিলেন তখন যবন-শাসনে জাতীয় জীবন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ধর্মের বার্ধক্য, উগ্রতেজস্বী রাজনীতিবিশারদ আর্য বীরেরা সব বিলাসপ্রিয় এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণ হয়ে পড়েছিল। ভারত হয়েছিল দুর্বল, নিচেষ্ট, নিদ্রায় উন্মুখ এবং ভোগপরায়ণ। বৈষ্ণব পদাবলি কৃষ্ণের গোপীজনবল্লভ ভাব বঙ্কিম পছন্দ করেননি। আসলে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তিনি চেয়েছিলেন সর্বাত্মক সংগ্রাম। আনন্দমঠের স্রষ্টা বাঙালি যুবকদের সেই চেতনাতেই উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। যে কারণে সাহিত্যসম্রাটের ‘কৃষ্ণচরিত্র’ নামক গদ্যে জাতীয় বীরের আদর্শ হিসেবে যোদ্ধা কৃষ্ণকেই তুলে ধরা হয়েছিল। সেই কৃষ্ণ যিনি সর্বত্র সর্বসময়ে সর্বগুণের অভিব্যক্তিতে উজ্জ্বল। যিনি অপরাজেয়, অপরাজিত, বিশুদ্ধ, পুণ্যময়, প্রীতিময়, দয়াময়, অনুষ্ঠেয়, কর্মে অপরাঙ্মুখ – ধর্মাত্মা, বেদজ্ঞ, নীতিজ্ঞ, লোকহিতৈষী, ন্যায়নিষ্ঠ, ক্ষমাশীল, নিরপেক্ষ, যোগমুক্ত, তপস্বী। যিনি মানুষী শক্তির দ্বারা কর্ম নির্বাহ করেন কিন্তু তাঁহার চরিত্র অমানুষ। সমসাময়িক আরেক মনীষী স্বামী বিবেকানন্দের মধ্যেও এই টানাপোড়েন লক্ষ করা যায়। বৈষ্ণব-প্রেমকে বিবেকানন্দ গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি শিষ্যদের বলতেন, -‘আর ওই যে মিনমিনে পিনপিনে, ঢোক গিলে গিলে কথা কয়, ছেঁড়ান্যাতা সাতদিন উপবাসীর মতো সরু আওয়াজ, সাত চড়ে কথা কয় না – ওগুলো হচ্ছে তমোগুণ, ওগুলো মৃত্যুর চিহ্ন, ও সত্ত্বগুণ নয়, ও পচা দুর্গন্ধ। সুরেন্দনাথ সেনের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে জানা যায় যখন বিবেকানন্দকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল উগ্র শক্তিসাধনার বদলে কেন তিনি শ্রীচৈতন্যদেব প্রচারিত প্রেমধর্মকে অবলম্বন করলেন না, তার উত্তরে ভয়াণক ক্রুব্ধ হয়ে রাগে ফেটে পড়ে তিনি যা বলেছিলেন তার মোদ্দা কথাটা হল – এই দেশতার দিকে একবার তাকিয়ে দেখ ওই রকম প্রেম প্রচারের ফল কী দাঁড়িয়েছে... গোটা জাতটাই পৌরূষহীন হয়ে পড়েছে... উড়িষ্যার সবটাই কাপুরুষের দেশ হয়ে গেছে... আর বাংলা, গত চারশো বছর ধরে রাধার প্রেমের পিছনে ছুটতে ছুটতে তার সমস্ত পৌরুষকেই সে খুইয়ে ফেলেছে। তাঁর দ্বন্দ্বময় চেতনা নিয়ে বেদান্তপন্থী বিবেকানন্দ ছিলেন শক্তির উপাসক অথচ তিনি মূর্তি-পূজার ঘোর বিরোধী ছিলেন। আবার এই শাক্ত বিবেকানন্দই ‘মুঝে বারি বনোয়ারি সেঁইয়া যানেকো দে...’ বলে একটি কৃষ্ণসংগীতও লিখে ফেলেছিলেন। যেখানে কৃষ্ণের প্রতি এক বাঁদি যাতে গাগরি ভরতে যেতে পারে তার কাকুতি মিনতি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তেমনি তাঁর একটি কবিতায় ‘ব্রজের উচ্ছ্বাস’ ‘গোপী-তপ্তশ্বাস’ এই ধরণের বৈষ্ণব অনুষঙ্গ এসেছে। অবশ্য কবিতার এক জায়গায় দেখা গেল মৃত্যরূপা এলোকেশীর ভীম তরবার হাতের বাঁশিটিকে খসিয়ে দিচ্ছে। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্র-পরিবারের সদস্য প্রমথ চৌধুরী পরকীয়ার উল্লেখ না করলেও তাঁর ‘কাব্য অশ্লীলতা – আলঙ্কারিক মত’ শীর্ষক আলোচনায় জানিয়ে দিলেন– ‘শ্লীলতা অশ্লীলতা সুরুচির কথা, সুনীতির কথা নয়...। ইংরেজ জাতি ঘোর নৈতিক বলে গণ্য, তবে মর্যাকলিটিকে তারা ইউটিলিটিতে পরিণত করেছে। আমরা ইংরেজের শিষ্য, ফলে আমাদের সুন্দর-অসুন্দর সৎ-অসৎ সত্যমিথ্যার জ্ঞান, ইংরেজি জ্ঞানের অনুরূপ। ...আমাদের পূর্বপুরুষদের অশ্লীলতা সম্বন্ধে ধারণা ইংরেজদের ধারণার সঙ্গে মেলে না বলে তা নিকৃষ্ট এমন কথা মুর্খ ছাড়া কেউই বলবেন না।’ রবীন্দ্র-ঘনিষ্ঠ বীরবল পরকীয়া নিয়ে সরাসরি মন্তব্যে না গেলেও আরেক রবীন্দ্র-পারিষদ শ্রীক্ষিতিমোহন শাস্ত্রী দীর্ঘ সময় বাউলদের জীবন ও দর্শন নিয়ে পরিশ্রমী গবেষণা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধ ‘বাংলার বাউল’। সেখানে তিনি সরাসরি পরকীয়া নিয়ে যে মূল্যায়ণ তুলে ধরেছেন তা এই রকম – “আসলে সমাজের সহিত বিরোধ ঘোষণার বা সমাজ-নীতি-দলনের জন্য ‘পরকীয়া’কে প্রার্থনা করা নহে। অপরকে চাওয়া হয় শুধু প্রেমের মহত্ব বুঝিতে। আপনাকে আপন করিবার মধ্যে প্রেমের প্রেমত্ব কৈ? লোহাকে সোনা করিলে তবেই পরশমণি। পরকে আপন করিতে পারিলে তবেই প্রেম। প্রেমের মহত্ব প্রমাণ করিতে চাহিলে চাই ‘পরকীয়া’। স্বকীয়ার উপর অধিকার তো আছেই, প্রেমের সেখানে আর কী রহিল করিবার? সমাজবিধান অনুসারেই সে আমার অধীকৃতা (অর্থাৎ possession)। আমার কাছে ধরা দিতে সে বাধ্য। ঘরের পাখি শিকার করিলে যেমন শিকার (sport)হয় না, তেমনি বাধ্য অধীকৃতকে লাভ করিয়া প্রেমের মহত্ব প্রকাশ হয় না। ... দাসত্বের মধ্যে প্রেম(?) তো একটা জুলুম মাত্র। তাই ভগবান প্রেমের ক্ষেত্রে মানবকে অপার মুক্ত দিয়েছে। ... তাই পরকীয়া না হইলে প্রেম কোনো অর্থ হয় না।” বোঝা যাচ্ছে ক্ষিতিমোহন পরকীয়ার সঠিক চেতনাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। কারণ বাউলরা হচ্ছে সহজপন্থী। সহজ-সাধনা প্রকৃত অর্থে কায়া-সাধনা। দেহ-নির্ভর। দেহসাধনাকে সহজিয়ারা বলেন ভাণ্ডের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ডের অখণ্ড লীলা। সুতরাং সেখানে দেহের মধ্যেই দেহাতীতকে উপলব্ধি করার অনন্ত সম্ভাবনা আছে। একইসঙ্গে এই সাধনা অহংকে বর্জন করার সাধনা। বাউলদের সাধনার একটি প্রাথমিক ধাপ চারিচন্দ্র-সাধনা। যেখানে একজন সাধককে শ্রীশরীরের যে চারটি বর্জ্যকে খেয়ে ফেলতে হয় সেগুলি হচ্ছে মল-মূত্র পুরুষের বীর্য এবং নারীদেহের মাসিকের রক্ত। অর্থাৎ সেখানে লজ্জা-ঘৃণা-ভয়-গর্ব যে উপাদানগুলি নিয়ে মানুষের অহং গড়ে উঠে তাদের পুরোপুরি বিসর্জন দিতে হয় বা খেয়ে হজম করে ফেলতে হয়। যা থেকে আবার মানব-মনে তৈরি হয় একটি খ-সম ভাব বা উদার আকাশের মতো বিশ্বজনীনতা যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মানব-প্রেমে। বিশ্ব-মানবের দরবারে বাংলার সব চেয়ে বড় দান এই মানবিকতা। সেই উপলবদ্ধি থেকেই মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি একদিন কুৎসিৎ জাতিভেদ প্রথার মূলে কুঠারাঘাত করে বলতে পেরেছিলেন – সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই। প্রান্তিক-বাংলার সহজ-সাধকের এই বাণীই আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব-মানবিকতার বীজমন্ত্র। সহজ-সাধনাকে অবশ্য শিষ্ট-সমাজ কোনোদিনই ভালো চোখে দেখেনি। কারণ এই সাধনা তান্ত্রিক-সাধনা। তার জন্য প্রয়োজন হয় সাধন-সঙ্গিনীর। উৎকৃষ্ট্ সাধন-সঙ্গিনী আবার সমাজের তথাকথিত নিম্ন-শ্রেণিতেই মেলে। ফলে সমাজের চোখে তা চরম ব্যাভিচারের জন্ম দেয়। যে কারণে পরকীয়া অনুরাগী সহজ-সাধকের দল সভ্য-ভব্য সমাজে চিরকাল ব্রাত্যই থেকে গেছে। অথচ লোকসমাজে জন্ম নেওয়া এই তন্ত্রের মূল অর্থ কিন্তু সর্ববিধ জ্ঞানের বিস্তার।(তন – জ্ঞান, ত্র-বিস্তার)। প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তা-ভাবনার বাইরে বেরিয়ে সমস্ত ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক এবং সংস্কারের মোড়ক সরিয়ে নিয়ে দেখলে দেখা যাবে তন্ত্র আসলে্ পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করার এক সৃষ্টিশাস্ত্র। অহং বিসর্জন দিয়ে নিজেকে নিয়ে নতুন করে ভাবা, নিজেকে ভিতর থেকে জাগানো বা নিজের সম্ভাবনার অনালোকিত অংশে আলো ফেলে ভিতরের সৃষ্টিশীলতাকে আবিষ্কার করা ও তাকে প্রাত্যহিক জীবন-চর্চায় প্রয়োগ করে নিজেকে আরো বেশি মনুষ্যপদবাচ্য করে গড়ে তোলা – এটাই একজন তন্ত্রসাধকের কাজ। যে বোধ থেকে শাক্ত কবি রামপ্রসাদ সেন বলেছিলেন – মন রে কৃষিকাজ জানো না, এমন মানব জমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা। সঠিক ভাবেই তন্ত্র মানে এই মানবজমিনের চাষ। নানা চিহ্ন দেখে অনুমান করা হয় বেদ-পুরাণ-মহাকাব্যেরও বহু আগে সুদূর অতীতের হরপ্পা-মহেঞ্জদড়ো সভ্যতাতেও কিন্তু তন্ত্রের অস্তিত্ত্ব ছিল। এবং আরো অনুমান করা যায় সেই সময়ে বিদ্যাচর্চা মানেই ছিল তন্ত্রচর্চা যার মাধ্যমে জ্ঞাণ-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে সিন্ধুবাসী এতটাই উন্নতি করতে পেরেছিল যে সেই তাম্র-সভ্যতার যুগেই তারা আধিপত্যবাদকে দূরে রেখে যুদ্ধমুক্ত শান্তি ও সামাজিক-সাম্যের পরিবেশে এক সুসংগঠিত নগর-সংস্কৃতি গড়ে তুলে দীর্ঘ দেড় হাজার বছর ধরে তাকে লালিত করেছিল। আরো বোঝা যায় সেই সমাজে যৌনতা নামক ট্যাবুটিও অনুপস্থিত ছিল। ফিরে আসা যাক রবীন্দ্র-প্রসঙ্গে। কবিগুরুর লেখালিখিতেও এসেছে পরকীয়া প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গ্রামসাহিত্য নামক প্রবন্ধের এক জায়গায় লোকসমাজে প্রচলিত সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন – “হরগৌরীকথায় দাম্পত্যবন্ধনে যেমন কতকগুলি বাধা বর্ণিত হইয়াছে, বৈষ্ণব গাথার প্রেমপ্রবাহেও তেমনি একমাত্র প্রবল বাধার উল্লেখ আছে --তাহা সমাজ । তাহা একাই এক সহস্র। বৈষ্ণব পদাবলীতে সেই সমাজবাধার চতুর্দিকে প্রেমের তরঙ্গ উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিতেছে। এমন-কি, বৈষ্ণব কাব্যশাস্ত্রে পরকীয়া অনুরক্তির বিশেষ গৌরব বর্ণিত হইয়াছে। সে গৌরব সমাজনীতির হিসাবে নহে সে কথা বলাই বাহুল্য। তাহা নিছক প্রেমের হিসাবে। ইহাতে যে আত্মবিস্মৃতি, বিশ্ববিস্মৃতি, নিন্দা-ভয়-লজ্জা-শাসন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ঔদাসীন্য, কঠিন কুলাচার -লোকাচারের প্রতি অচেতনতা প্রকাশ পায়, তদ্‌দ্বারা প্রেমের প্রচণ্ড বল, দুর্বোধ রহস্য, তাহার বন্ধন-বিহীনতা, সমাজ-সংসার স্থান-কাল-পাত্র এবং যুক্তিতর্ক-কার্যকারণের অতীত একটা বিরাট ভাব পরিস্ফুট হইয়া উঠে। এই কারণে যাহা বিশ্বসমাজে সর্বত্রই একবাক্যে নিন্দিত সেই অভ্রভেদী কলঙ্কচূড়ার উপরে বৈষ্ণব কবিগণ তাঁহাদের বর্ণিত প্রেমকে স্থাপন করিয়া তাহার অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন করিয়াছেন। এই সর্বনাশী, সর্বত্যাগী, সর্ববন্ধনচ্ছেদী প্রেমকে আধ্যাত্মিক অর্থে গ্রহণ করিতে না পারিলে কাব্য হিসাবে ক্ষতি হয় না, সমাজনীতি হিসাবে হইবার কথা”। ঔপনিষদিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের এই পুত্র বেদান্তের ব্রহ্মের সঙ্গে মেলাতে চেয়েছেন সহজিয়া-সাধনার মনের মানুষ-কে। যা তাঁরও অন্তরদেবতা বা জীবনদেবতা। অথচ বেদান্ত মূলত পুঁথি-নির্ভর জ্ঞানমার্গীয় এক দর্শন, যাকে সহজিয়ারা সবসময়ে সযত্নে দূরে রেখেছেন। সে কথা অবহিত হয়েও রবীন্দ্রনাথ সহজিয়াদের পরকীয়া-চর্চাকে বলেছেন আপন স্বরাজ। তার পরপুরুষকে রূপান্তরিত করেছেন বেদান্তের পরমপুরুষে। রবীন্দ্রভাবনায় বাউলদের ভাণ্ড হচ্ছে উপনিষদের আত্মা বা খণ্ডাকাশ আর তাদের ব্রহ্মাণ্ড হচ্ছে উপনিষদের পরমাত্মা বা মহাকাশ। লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ যে লেকচার দিয়েছিলেন তা সংকলিত হয় ‘Religion og Man’ নামে। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি ‘কমলা বক্তৃতা’-য় যে-কথাগুলি বলেন তার সংকলনের নাম করেন ‘মানুষের ধর্ম”। গুরুদেবের এই বক্তৃতামালা তৈরির পিছনে বাউল এবং ভক্তি-সাধক দাদু-র উপর ক্ষিতিমোহন সেনের যে কাজ তার প্রভাব স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ তা স্বীকারও করেছেন। ‘মানুষের ধর্ম’-শীর্ষক প্রথম বক্তৃতাতেই সত্য-সন্ধানী রবীন্দ্রনাথ জানিয়ে দিয়েছেন “... এই বোধেরই শেষ কথা এই যে যে মানুষ আপনার আত্মার মধ্যে অন্যের আত্মাকে এবং অন্যের আত্মার মধ্যে আপনার আত্মাকে জানে সেই জানে সত্যকে”। বৈষ্ণব-সাধকদের তন্ত্র-সাধনা তথা পরকীয়াকে পছন্দ না করলেও কৈশোরকাল থেকেই বৈষ্ণব পদাবলির প্রেম-ভাবনার প্রতি বিশেষ রবীন্দ্র-অনুরাগের কথা আমরা জানি। চণ্ডীদাস-বিদ্যাপতির গানের কথা ও সুর রবীন্দ্রসৃষ্টিকে যে ভালোরকম প্রভাবিত করেছিল সে কথাও আমাদের অজানা নয়। আলোচনার শেষপর্বে এসে সত্য ও সুন্দরের উপাসক রবীন্দ্রনাথের লেখা “বৈষ্ণব-কবিদের গান” প্রবন্ধটির প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সেখানে তিনি বলছেন – “সৌন্দর্য-স্বরূপের হাতে সমস্ত জগৎই একটি বাঁশি। ইহার রন্ধ্রে রন্ধ্রে নূতন নূতন সুর উঠিতেছে। মানুষের মন আর কি ঘরে থাকে? তাই সে ব্যাকুল হইয়া বাহির হইতে চায়। সৌন্দর্যই তাঁহার আহ্বান-গান। সৌন্দর্যই তসেই দৈববানী। কদম্ব ফুল তাঁহার বাঁশির স্বর, বসন্ত ঋতু তাঁহার বাঁশির স্বর। কোকিলের পঞ্চম তান বাঁশির স্বর। বাঁশির স্বর কি বলিতেছে! জ্ঞান্দাস হাসিয়া বুঝাইলেন সে কেবল বলিতেছে “রাধে তুমি আমার”... আর কিছুই না আমরা শুনিতেছি, সেই অসীম সৌন্দর্য অব্যক্ত কণ্ঠে আমারই নাম ধরিয়া ডাকিতেছেন। তিনি বলিতেছেন... তুমি আমার... আমার কাছে আইস”। এই জন্য আমাদের চারিদিকে যখন সৌন্দর্য বিকশিত হইয়া উঠে তখন আমরা যেন একজন কাহার বিরহে কাতর হই, যেন একজন কাহার সহিত মিলনের জন্য উৎসুক হই - - সংসারে আর যাহারই প্রতিদিন মন দিই, মনের পিপাসা যেন দূর হয় না। এই জন্য সংসারে থাকিয়া আমরা যেন চিরবিরহে কাল কাটাই। কানে একটি বাঁশির সুর আসিতেছে, মন উদাস হইয়া যাইতেছে, অথচ এই সংসারের অন্তঃপুর হইতে বাহির হইতে পারি না। এই জন্য সংসারে থাকিয়া আমরা যেন চিরবিরহে কাল কাটাই। কে বাঁশি বাজাইয়া আমাদের মন হরণ করিল, তাহাকে দেখিতে পাই না; সংসারের ঘরে ঘরে তাহাকে খুঁজিয়া বেড়াই। অন্য যাহারই সহিত মিলন হউক না কেন, সেই মিলনের মধ্যে এক চিরস্থায়ী বিরহের ভাব প্রচ্ছন্ন থাকে।” ‘খাঁচার পাখি ও বনের পাখি’ বা ‘ঘরে-বাহিরে’-র দ্বন্দ্ব রবীন্দ্রনাথের চিন্তাজগৎকে সারাজীবন অস্থির রেখেছে। অচেনা বা সুদূরের আহ্বানে কবির মনে যে চঞ্চলতা তৈরি হয়েছে তা তিনি গোপন করেননি। রবীন্দ্রনাথ-কথিত এই ঘর আসলে স্বকীয়া এবং বাহির হল পরকীয়া। স্বকীয়া মানে আমাদের চেনা-জানার চিরপরিচিত এই সীমাবদ্ধ জগৎ। আর বাহির মানে যা অচেনা যা অজানা এবং অসীম যাকে পাবার জন্য আমরা হেদিয়ে মরি, তাই হল পরকীয়া। সংগীতের কথা ও সুর ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিন্তা-ভাবনা পোষাক-আশাকে সহজিয়া ভাবকে অনেকটাই গ্রহণ করেছিলেন। যতই দিন গেছে সহজিয়াদের দেহ-সাধনা ক্রমশই উন্নীত হয়েছে এক মানসিক ও মানবিক সাধনায়। দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথে তা চূড়ান্ত আকার নিয়েছে। ওই নিবন্ধেই রবীন্দ্রনাথ বলছেন - “শঙ্খকে সমুদ্র হইতে তুলিয়া আনিলেও সে সমুদ্রের গান ভুলিতে পারে না। উহা কানের কাছে ধর, উহা হইতে অবিশ্রান্ত সমুদ্রের গান শুনিতে পাইবে। পৃথিবীর সৌন্দর্যের মর্মস্থলে তেমনি স্বর্গের গান বাজিতে থাকে। কেবল বধির তাহা শুনিতে পায় না। পৃথিবীর পাখির গানে পাখির গানের অতীত আরেকটি গান শুনা যায়, প্রভাতের আলোকে প্রভাতের আলোর অতিক্রম করিয়া আরেকটি আলোক দেখিতে পাই, সুন্দর কবিতায় কবিতার অতীত আরেকটি সৌন্দর্য মহাদেশের তীরভূমি চোখের সম্মুখে রেখার মতো পড়ে। একবিংশ-শতকের পৃথিবীতে নতুন ফেনোমেনাগুলির নাম অন্তর্জাল, বিশ্বায়ন এবং অপরায়ন; যা কেষ্ট-ঠাকুরের বাঁশি তথা পরকীয়ার জগৎটিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন কোনো মানুষই আর একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। নিজের চেনা-জানা এলাকা ছেড়ে অন্যের অঞ্চলেও সে হামেশাই ঢুঁ মারতে চাইছে। রবি ঠাকুরও তো জীবনের অন্তিম পর্বে এসে নিজের চিরকালের লেখালিখি ও সংগীতের পৃথিবী ছেড়ে ছবি-আঁকার জগতে প্রবেশ করে এক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিলেন। এক হিসেবে সেটাই ছিল তাঁর নতুন পরকীয়া। নিজের এলাকা থেকে অন্যের এলাকায় ঢুকে পড়াকে আমরা আরেক অর্থে বলতে পারি জাত-খোয়ানা, যার শুরুটা করেছিল চর্যাপদের সিদ্ধাই-যোগীরা, তারপর বৈষ্ণব-সমাজ। ব্রাহ্মণ-সন্তান চণ্ডীদাস শুধু যে রজকিনির সঙ্গে প্রেম করেছিলেন তাই নয়, বিকট দর্শনা মুণ্ডমালিনী বাসুলীর গণ হয়েও তিনি বৈষ্ণব-প্রেমের কাব্য লিখেছিলেন। এইভাবেই বাঙালির চরিত্রে উদারতা ও মনবিকতার স্ফূরণ ঘটেছিল। তার মূলেও সেই পরকীয়া। সুতরাং যে শব্দার্থ দিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম দেখা গেল বিস্তর টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে আজকের দিনে তার অসামান্য বিস্তার ঘটেছে। আলোচনার শেষে এখন তাই পরকীয়া সম্পর্কে বলা যায়, তা আসলে একটি উন্মুক্ত পরিসর। একটি তীরভূমি। কিছুটা রবি-ঠাকুরের ভাষা ধার করে আরো বলা যায় পরকীয়া এই সংসারের প্রান্তসীমায় অবস্থিত একটি বিস্তৃত বাতায়ন-বিশেষ। যার মধ্যে দিয়ে আমরা বাইরের পৃথিবীকে উপলব্ধি করতে পারি। অতঃপর, আমাদের প্রিয় ঠাকুর-সাহেব যেমন তাঁর ‘বৈষ্ণব কবিদের গান’-এ বলেছেন, অন্তিমে তেমনি বলি – ‘পৃথিবীর আপিসের কাজে শ্রান্ত হইলে’ আমরা যেখানে ‘স্বর্গের বায়ু সেবন করিতে যাই’, সেই পরিসরের নামই পরকীয়া।

(নিরুক্ত পত্রিকায় প্রকাশিত)

No comments:

Post a Comment