বাজার অর্থনীতি ও একুশ শতকের বাংলা কবিতা ০ মুরারি সিংহ
(প্রথম পর্ব)
নতুন সহস্রাব্দের নতুন শতকে চারপাশে অজস্র হই-চই হট্টগোল ডামাডোল এবং আরো নানান বাহার চমক-ঠমক পেরিয়ে যেসব উজ্জ্বল ঝকঝকে তরুণ-তরুণী কবিতাকে ভালোবেসে এখনো বাংলা কবিতা লিখতে আসছেন একজন সামান্য কবিতা-অনুরাগী হয়ে আলোচনা শুরুর আগে তাদের তাঁদের স্বগত জানাই।
প্রথমেই যে কথাটা বলার তার বিষয় বাজার অর্থনীতি ও পুঁজিবাদ। বিশ্বায়নের পৃথিবীতে এখন রমরম করে চলছে বাজার অর্থনীতির যুগ। তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিরা।একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে তারা রাজনীতি-সামাজ-সংস্কৃতির মতো ক্ষেত্রগুলিতেও নানাভাবে ছড়ি ঘোরাতে চাইছে, সেখানেও নিজেদের দখলদারি কায়েম করতে চাইছে। নতুন ছেলেমেয়েদের পক্ষে এসব ব্যাপার সবটা সব সময় বোঝা সম্ভব নয়, আমিও যে সম্পূর্ণ বুঝতে পারি এমন আহম্মকি দাবি করি না। তবে মাঝে মাঝে নানা অভিজ্ঞতার মধ্যমে যে একটু-আধটু আভাস পাই তারই কিছু কিছু ব্যক্ত করার জন্যে এই আলোচনার সূত্রপাত।
অনেকেই হয়ত প্রশ্ন করবেন, বাজার-অর্থনীতি বা পুঁজির সঙ্গে কবিতার কী সম্পর্ক। তেমন প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। ভেবে দেখুন, বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতি-সংস্কৃতি-ধর্মকর্ম-খেলাধূলা-অর্থ-সমাজ কোনোটাই যে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয় এটা বোঝার জন্যে সমাজতাত্ত্বিকের বিদগ্ধতার দরকার হয় না। একটু চোখ-কান খোলা রেখে সামান্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রয়োগ করলেই তার আঁচ পাওয়া যায়। এমনকি সবকিছুর পিছনেই যে অদৃশ্য এক হাতের খেলা চলছে সেটাও বোঝা সম্ভব হয়। আবার সেই হাত যে পুঁজিবাদের হাত, বাজার অর্থনীতির হাত এই রহস্যটা ভেদ করতেও কোনো ফেলু মিত্তির সাজতে হয় না। পাড়া থেকে রাজ্য, দেশ সারা বিশ্ব সব জায়গাতে একই ছবি। মাননীয় পাঠক, তাকিয়ে দেখুন, রাষ্ট্র যেখানে এখনো পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে পারেনি, সেখানেও কত অনায়াসেই পৌঁছে যাচ্ছে মিনারেল ওয়াটার বা ঠাণ্ডা-পানীয়ের বোতল, ব্যাঙের ছাতার মতো ইংলিশ-মিডিয়াম ইস্কুল, প্রাইভেট হাসপাতাল, নার্সিং হোম, হাটে-বাজারে-শহরে-গঞ্জে দোকানে দোকানে অজস্র ভোগ্যপণ্য থরে থরে সাজানো। আর টিভি-চ্যানেলে নানান মিডিয়ায় ঝাঁক-ঝাঁক বিজ্ঞাপণ যেন এক একটি বিশেষ পণ্য কিনে না ভোগ করলে আপনার জীবনটাই বৃথা। তাদের টার্গেট গ্রুপ বাড়ির পুঁচকেটি থেকে মহিলা, পুরুষ, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কেউ বাদ নেই। সুতরাং এখন আপনার-আমার ব্যক্তিগত পছন্দটিও ঠিক করে দিচ্ছে অন্য পক্ষ। এমন কী শুধু সুখ বা আনন্দ নয়, আপনার দুঃখ-কষ্ট বা সদ্য পরিজন-হারানোর শোকটিকে পর্যন্ত দাঁড়াতে হচ্ছে টিভি-ক্যামেরার মুখোমুখি, নেপালের ভূমিকম্প, চিনের বন্যা বা সুদান-সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষকেও আজ পরিবেশন করা হচ্ছে আপনার ড্রয়িং-রুম বা ডাইনিং-টেবিলের পাশে রাখা টিভি-স্ক্রিনে। অর্থাৎ বাজারের পণ্য-হবার হাত থেকে কারো রেহাই নেই। রেহাই নেই পুঁজিবাদের করাল থাবা থেকে।
ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলালেই জানা যায় এই পুঁজিবাদের জন্ম ইউরোপের বহু-গর্বের বিশ্বজুড়ে বহু-চর্চিত এনলাইটেনমেন্ট বা দীপায়নের গর্ভে। দেশিয় জনগণের উপর শোষণ-শাসনের স্টিম-রোলার চালানোতে তুষ্ট না হয়ে শিক্ষিত ও সভ্য বলে কথিত সাগরপারের সেই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি শুরু করেছিল অন্য-দেশ দখল করে তাকে নিজেদের কলোনি বানিয়ে সেখানে অবাধে ও নির্বিচারে লুঠপাট-শাসন-শোষণ-হত্যার মহান কর্মসূচি। সেই পালাগানের সূত্রে উনবিংশ শতাব্দী দেখল পুঁজিবাদের এক নতুন রূপ, যার নাম সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু ইতিহাসের এমনি পরিহাস সেই সাম্রাজ্যবাদের মাটিতেই রোপিত হল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার বীজ। ফলে দেশে দেশে যখন বিদেশি শাসনের লড়াই ক্রমশই তীব্র থেকে তীব্রতর হল ততই ঘনীভূত হল বিদেশি-শাসকদের সংকট। নিজেদের দেশে শোষণের পরিসর যখন আর বাড়ানো যাচ্ছে না, আলোকবর্তিকার প্রভুরা তখন সব লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিয়ে নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু করে দিল। তার সঙ্গে জড়িয়ে নিল সমস্ত বিশ্বকে।
যুদ্ধ তো নয় সে এক বিশাল পতন। বিশ্বব্যাপী সেই অকারণ ও নিষ্ঠুর নরমেধযজ্ঞে সমস্ত প্রচলিত নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও মানবিকতা চুরচুর করে ভেঙে পড়েছে। বিশ্বমানবের উপর এই চরম আঘাত নেমে এসেছে আবার সেই রাষ্ট্রগুলির হাত দিয়ে তথাকথিত আলোকপ্রাপ্তির সুবাদে যারা এতদিন নিজেদের পৃথিবীর সব চেয়ে সভ্য ও শিক্ষিত দেশ বলে দাবি করে আসছিল। সভ্যতার মুখোসের আড়াল ভেঙে তাদের পাশবিক লোভ ও লালসার আসল দানবিক মুখ বেরিয়ে পড়েছে। আবার অন্যদিকে শ্রমিক-বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে জন্ম নিয়েছে সাম্যবাদী রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়া। দেশিয় রাজনীতিতে ঘটে গেছে জালিয়ানাবাগ হত্যাকাণ্ড, সূচনা হয়েছে অসহযোগ আন্দোলনের। ভূমিষ্ট হয়েছে কমিউনিস্টপার্টির। তারপর ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করার লক্ষ্যে কত লড়াই, কোনোটা সহিংস কোনোটা অহিংস, কত প্রাণ বলিদান, আজাদ-হিন্দ-বাহিনী গঠন করে নেতাজির রণ-হুংকার।
এদিকে দেশিয় সমাজও তখন ভাঙছে। গ্রাম-গঞ্জে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ, শিক্ষিতের সংখ্যা-বৃদ্ধি, কলকাতা ও আশেপাশে কলকারখানার সংখ্যা-বৃদ্ধি সবকিছুর ফলে কলকাতায় আসা মানুষের স্রোত বাড়ছে। তারপর আবার একটা বিশ্বযুদ্ধ। দুটো বিশ্বযুদ্ধ ঘটে যাবার পর নানা দেশ থেকে বিদেশি শক্তিগুলি পিছু হঠতে শুরু করল। এদেশেও তাদের মাতব্বরির শেষ ঘণ্টা বেজে গেল। কিন্তু ছেড়ে যাবার আগে কোমর ভাঙা শ্বেতাঙ্গ-শাসকরা সেখানেও এক মোক্ষম চাল চেলে দিল। ঘটে গেল ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, প্রচুর রক্তপাত, অজস্র হত্যা এবং প্রবল উদ্বাস্তু স্রোত। ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করল বটে কিন্তু দেশ দ্বি-খণ্ডিত হল।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়-অর্ধ হল উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্ব। এই পর্বে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ দেশ ছাড়া হলেও, রয়ে গেল তার ছায়া এবং সেই ছায়াতেই লালিত-পালিত হল দেশিয় রাজনীতি ও অর্থনীতি। বিদেশি পুঁজির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে যেমন দেশিয় পুঁজিপতিরা ক্রমশই ফুলে-ফেঁপে উঠল তেমনি তাদের সঙ্গে স্বাধীনদেশের রাজনীতিকদের একটা অশুভ আঁতাত তৈরি হল। তলে তলে চলতে থাকল নানা অপকর্মের খেলা। তবে বেসরকারী পুঁজির পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের ধাঁচে সরকারি পুঁজি বিনিয়োগের পথটি খোলা থাকার ফলে টাটা-বিড়লারা বাজারের নিরঙ্কুশ দখল নিতে পারেনি। সেপথও খুলে গেল গত শতকের শেষ দশকে এসে সমাজতন্ত্রের মোহ কাটিয়ে অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফলে। অবশ্য তখন নতুন করে নতুন মোড়কে হাজির হল বিদেশি পুঁজিও। এই দেশি-বিদেশি পুঁজির মধ্যে শুরু হল প্রতিযোগিতা, চলল বাজার দখলের লড়াই।
আমরা দেখছি দিনে দিনে সে লড়াই কীভাবে প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। তবে খেয়াল করে দেখুন, এই পর্বে এসে পুঁজিবাদ কেমন তার রূপ বদলেছে। প্রথম পর্বের সেই ভয়াল-ভয়ংকর দাঁত-নখ সব সে গুটিয়ে ফেলেছে। এখন সে বদলে ফেলেছে তার কলা-কৌশল। আত্মপ্রকাশ করেছে জনগণের পরম বন্ধু হিসেবে। জনগণকে নানান সুযোগ-সুবিধা-সুখ-শান্তিতে ভরিয়ে দেবার জন্যে তার কত চিন্তা। কত অফার, কত ছাড়, বিনা সুদে মাসিক কিস্তিতে কত ঋণের সুবিধে। তুমি শুধু একবার হ্যাঁ বলো, তোমার ঘর জিনিসে ভরিয়ে দিয়ে যাবে। তোমাকে ক্রেতা বানিয়ে ছাড়বে। কী মজার খেলা, তাই না! সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্যে রাজনীতিক এবং পুঁজিপতি কারো যেন রাতে ঘুম নেই। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলেই একথা বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না যে রাজনীতিকদের কাছে সাধারণ মানুষ যেমন একজন ভোটারমাত্র, বাজারের কাছেও সে তেমনি একজন উপভোক্তা ছাড়া কিছু নয়। তার মানুষ পরিচয়টাই যেন আজ বিলুপ্তপ্রায়।
অনেকেই হয়ত প্রশ্ন করবেন, বাজার-অর্থনীতি বা পুঁজির সঙ্গে কবিতার কী সম্পর্ক। তেমন প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। ভেবে দেখুন, বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতি-সংস্কৃতি-ধর্মকর্ম-খেলাধূলা-অর্থ-সমাজ কোনোটাই যে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয় এটা বোঝার জন্যে সমাজতাত্ত্বিকের বিদগ্ধতার দরকার হয় না। একটু চোখ-কান খোলা রেখে সামান্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা প্রয়োগ করলেই তার আঁচ পাওয়া যায়। এমনকি সবকিছুর পিছনেই যে অদৃশ্য এক হাতের খেলা চলছে সেটাও বোঝা সম্ভব হয়। আবার সেই হাত যে পুঁজিবাদের হাত, বাজার অর্থনীতির হাত এই রহস্যটা ভেদ করতেও কোনো ফেলু মিত্তির সাজতে হয় না। পাড়া থেকে রাজ্য, দেশ সারা বিশ্ব সব জায়গাতে একই ছবি। মাননীয় পাঠক, তাকিয়ে দেখুন, রাষ্ট্র যেখানে এখনো পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে পারেনি, সেখানেও কত অনায়াসেই পৌঁছে যাচ্ছে মিনারেল ওয়াটার বা ঠাণ্ডা-পানীয়ের বোতল, ব্যাঙের ছাতার মতো ইংলিশ-মিডিয়াম ইস্কুল, প্রাইভেট হাসপাতাল, নার্সিং হোম, হাটে-বাজারে-শহরে-গঞ্জে দোকানে দোকানে অজস্র ভোগ্যপণ্য থরে থরে সাজানো। আর টিভি-চ্যানেলে নানান মিডিয়ায় ঝাঁক-ঝাঁক বিজ্ঞাপণ যেন এক একটি বিশেষ পণ্য কিনে না ভোগ করলে আপনার জীবনটাই বৃথা। তাদের টার্গেট গ্রুপ বাড়ির পুঁচকেটি থেকে মহিলা, পুরুষ, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কেউ বাদ নেই। সুতরাং এখন আপনার-আমার ব্যক্তিগত পছন্দটিও ঠিক করে দিচ্ছে অন্য পক্ষ। এমন কী শুধু সুখ বা আনন্দ নয়, আপনার দুঃখ-কষ্ট বা সদ্য পরিজন-হারানোর শোকটিকে পর্যন্ত দাঁড়াতে হচ্ছে টিভি-ক্যামেরার মুখোমুখি, নেপালের ভূমিকম্প, চিনের বন্যা বা সুদান-সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষকেও আজ পরিবেশন করা হচ্ছে আপনার ড্রয়িং-রুম বা ডাইনিং-টেবিলের পাশে রাখা টিভি-স্ক্রিনে। অর্থাৎ বাজারের পণ্য-হবার হাত থেকে কারো রেহাই নেই। রেহাই নেই পুঁজিবাদের করাল থাবা থেকে।
ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলালেই জানা যায় এই পুঁজিবাদের জন্ম ইউরোপের বহু-গর্বের বিশ্বজুড়ে বহু-চর্চিত এনলাইটেনমেন্ট বা দীপায়নের গর্ভে। দেশিয় জনগণের উপর শোষণ-শাসনের স্টিম-রোলার চালানোতে তুষ্ট না হয়ে শিক্ষিত ও সভ্য বলে কথিত সাগরপারের সেই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি শুরু করেছিল অন্য-দেশ দখল করে তাকে নিজেদের কলোনি বানিয়ে সেখানে অবাধে ও নির্বিচারে লুঠপাট-শাসন-শোষণ-হত্যার মহান কর্মসূচি। সেই পালাগানের সূত্রে উনবিংশ শতাব্দী দেখল পুঁজিবাদের এক নতুন রূপ, যার নাম সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু ইতিহাসের এমনি পরিহাস সেই সাম্রাজ্যবাদের মাটিতেই রোপিত হল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার বীজ। ফলে দেশে দেশে যখন বিদেশি শাসনের লড়াই ক্রমশই তীব্র থেকে তীব্রতর হল ততই ঘনীভূত হল বিদেশি-শাসকদের সংকট। নিজেদের দেশে শোষণের পরিসর যখন আর বাড়ানো যাচ্ছে না, আলোকবর্তিকার প্রভুরা তখন সব লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিয়ে নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ শুরু করে দিল। তার সঙ্গে জড়িয়ে নিল সমস্ত বিশ্বকে।
যুদ্ধ তো নয় সে এক বিশাল পতন। বিশ্বব্যাপী সেই অকারণ ও নিষ্ঠুর নরমেধযজ্ঞে সমস্ত প্রচলিত নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও মানবিকতা চুরচুর করে ভেঙে পড়েছে। বিশ্বমানবের উপর এই চরম আঘাত নেমে এসেছে আবার সেই রাষ্ট্রগুলির হাত দিয়ে তথাকথিত আলোকপ্রাপ্তির সুবাদে যারা এতদিন নিজেদের পৃথিবীর সব চেয়ে সভ্য ও শিক্ষিত দেশ বলে দাবি করে আসছিল। সভ্যতার মুখোসের আড়াল ভেঙে তাদের পাশবিক লোভ ও লালসার আসল দানবিক মুখ বেরিয়ে পড়েছে। আবার অন্যদিকে শ্রমিক-বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে জন্ম নিয়েছে সাম্যবাদী রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়া। দেশিয় রাজনীতিতে ঘটে গেছে জালিয়ানাবাগ হত্যাকাণ্ড, সূচনা হয়েছে অসহযোগ আন্দোলনের। ভূমিষ্ট হয়েছে কমিউনিস্টপার্টির। তারপর ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করার লক্ষ্যে কত লড়াই, কোনোটা সহিংস কোনোটা অহিংস, কত প্রাণ বলিদান, আজাদ-হিন্দ-বাহিনী গঠন করে নেতাজির রণ-হুংকার।
এদিকে দেশিয় সমাজও তখন ভাঙছে। গ্রাম-গঞ্জে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ, শিক্ষিতের সংখ্যা-বৃদ্ধি, কলকাতা ও আশেপাশে কলকারখানার সংখ্যা-বৃদ্ধি সবকিছুর ফলে কলকাতায় আসা মানুষের স্রোত বাড়ছে। তারপর আবার একটা বিশ্বযুদ্ধ। দুটো বিশ্বযুদ্ধ ঘটে যাবার পর নানা দেশ থেকে বিদেশি শক্তিগুলি পিছু হঠতে শুরু করল। এদেশেও তাদের মাতব্বরির শেষ ঘণ্টা বেজে গেল। কিন্তু ছেড়ে যাবার আগে কোমর ভাঙা শ্বেতাঙ্গ-শাসকরা সেখানেও এক মোক্ষম চাল চেলে দিল। ঘটে গেল ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, প্রচুর রক্তপাত, অজস্র হত্যা এবং প্রবল উদ্বাস্তু স্রোত। ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করল বটে কিন্তু দেশ দ্বি-খণ্ডিত হল।
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়-অর্ধ হল উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্ব। এই পর্বে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ দেশ ছাড়া হলেও, রয়ে গেল তার ছায়া এবং সেই ছায়াতেই লালিত-পালিত হল দেশিয় রাজনীতি ও অর্থনীতি। বিদেশি পুঁজির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে যেমন দেশিয় পুঁজিপতিরা ক্রমশই ফুলে-ফেঁপে উঠল তেমনি তাদের সঙ্গে স্বাধীনদেশের রাজনীতিকদের একটা অশুভ আঁতাত তৈরি হল। তলে তলে চলতে থাকল নানা অপকর্মের খেলা। তবে বেসরকারী পুঁজির পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের ধাঁচে সরকারি পুঁজি বিনিয়োগের পথটি খোলা থাকার ফলে টাটা-বিড়লারা বাজারের নিরঙ্কুশ দখল নিতে পারেনি। সেপথও খুলে গেল গত শতকের শেষ দশকে এসে সমাজতন্ত্রের মোহ কাটিয়ে অর্থনীতির বিশ্বায়নের ফলে। অবশ্য তখন নতুন করে নতুন মোড়কে হাজির হল বিদেশি পুঁজিও। এই দেশি-বিদেশি পুঁজির মধ্যে শুরু হল প্রতিযোগিতা, চলল বাজার দখলের লড়াই।
আমরা দেখছি দিনে দিনে সে লড়াই কীভাবে প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। তবে খেয়াল করে দেখুন, এই পর্বে এসে পুঁজিবাদ কেমন তার রূপ বদলেছে। প্রথম পর্বের সেই ভয়াল-ভয়ংকর দাঁত-নখ সব সে গুটিয়ে ফেলেছে। এখন সে বদলে ফেলেছে তার কলা-কৌশল। আত্মপ্রকাশ করেছে জনগণের পরম বন্ধু হিসেবে। জনগণকে নানান সুযোগ-সুবিধা-সুখ-শান্তিতে ভরিয়ে দেবার জন্যে তার কত চিন্তা। কত অফার, কত ছাড়, বিনা সুদে মাসিক কিস্তিতে কত ঋণের সুবিধে। তুমি শুধু একবার হ্যাঁ বলো, তোমার ঘর জিনিসে ভরিয়ে দিয়ে যাবে। তোমাকে ক্রেতা বানিয়ে ছাড়বে। কী মজার খেলা, তাই না! সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্যে রাজনীতিক এবং পুঁজিপতি কারো যেন রাতে ঘুম নেই। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলেই একথা বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না যে রাজনীতিকদের কাছে সাধারণ মানুষ যেমন একজন ভোটারমাত্র, বাজারের কাছেও সে তেমনি একজন উপভোক্তা ছাড়া কিছু নয়। তার মানুষ পরিচয়টাই যেন আজ বিলুপ্তপ্রায়।
No comments:
Post a Comment