বাজার অর্থনীতি ও একুশ শতকের বাংলা কবিতা (তৃতীয় পর্ব) ০
মুরারি সিংহ
কিন্তু এসবের মধ্য থেকেও
নতুনের সন্ধানীরা কাঙ্ক্ষিত উদ্দীপনা পেলেন না। পেলেন না মননের সমৃদ্ধি। কারণ
সেখানে যন্ত্র ও যন্ত্রণা-নিনাদিত বৈশ্য যুগের অবিশ্বাস ও অবক্ষয়ের সঠিক প্রতিফলন
ছিল না। ততদিনে ইংরেজি শিক্ষার সুবাদে তাঁদের জানা হয়ে গেছে ইউরোপীয় সাহিত্য, ফ্রয়েডের
নবমনস্তত্ত্বজ্ঞান ও মার্ক্সের সর্বহারার মতবাদ। জেনেছেন ওমর খৈয়ামের আবেদন।তখন আদিগন্ত
ছায়া-বিস্তারকারী রবীন্দ্রচেতনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তাঁদের মনে হচ্ছে সর্বত্যাগী বৈরাগী
বা সন্ন্যাসী হবার মধ্যে যেমন আনন্দ আছে, অনাচারী ব্যাভিচারী লম্পট হবার মধ্যেও কিছু কম আনন্দ নেই। নিজেদের রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য সেই ভাবনা থেকেই কল্লোল-পত্রিকার সূত্রপাত।তাকে কেন্দ্র করে
নতুন সাহিত্য-আন্দোলন। সেই আন্দোলনকারীদের
কাছে মানুষের
মানে দাঁড়াল রক্তমাংস হাড় মেদমজ্জা ক্ষুধা তৃষ্ণা লোভ কাম হিংসা সমেত গোটা মানুষ।সেটা অবশ্য জগদীশগুপ্ত, মণীশঘটক(যুবনাশ্ব), বুদ্ধদেববসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
এঁদের গল্প-উপন্যাস যতটা বেশি প্রকট হয়েছিল কবিতায় ততটা নয়। তবে নজরুল ইসলাম অচিন্ত্যসেনগুপ্ত
বুদ্ধদেববসু প্রেমেন্দ্রমিত্র জীবনানন্দদাশ এঁদের কবিতায় একটা দ্রোহ একটা ভিন্ন উচ্চারণের
বীজ অবশ্যই বোনা হয়ে গিয়েছিল।ঔপনিবেশিক
পর্বের ভিক্টোরীয় মূল্যবোধও রবীন্দ্রকবিতার মার্জিত শুচিতায় গীতগোবিন্দ লালিত ও বিদ্যাসুন্দর পালিত যে শৃঙ্গার রস ও যৌনতার প্রকাশ কিছুকাল ঢাকা পড়েছিল।নতুন সময়ে পশ্চিমি হাওয়ার নতুন মেজাজ গায়ে মাখিয়ে কল্লোলের
গল্প-উপন্যাস-কবিতা বাঙালির সেই স্মৃতিকে
আবার উসকে দিল।
নতুন প্রজন্মের কবিদের
কাছে কল্লোলের কোলাহল রবীন্দ্র-উপনিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার যে পথ-নির্মাণ করে দিল
বুদ্ধদেব বসু ছাড়াও পরবর্তী সময়ে সেই পথে সামিল হলেন অজিত দত্ত-সুধীনদত্ত-বিষ্ণুদে-জীবনানন্দদাশ-অমিয়চক্রবর্তী-সমরসেন এঁদের মতো কবিরা। বাংলা কবিতায় শুরুহল
রবীন্দ্রোত্তর পর্ব। তাঁদের পুষ্টি জোগান দিল পশ্চিমের প্রতীক
আন্দোলন এবং ফরাসি সাহিত্যের বোদলেয়র থেকে শুরু করে ইংরেজি সাহিত্যের এলিয়টের কবিতা। তাঁরা যে ধারার কাব্যচর্চা
করলেন তার নাম আধুনিকতাবাদ। বিশেষজ্ঞদের চোখে চিহ্ন-প্রকরণ বিচার করে বাংলা-কবিতায় আধুনিকতা বলতে আমরা যা বুঝি তা কিন্তু
ইউরোপীয় আধুনিকতা যা এদেশে এসেছিল ঔপনিবেশিক শাসনকালে, পরাধীনতার সময়ে। তাই এখানে আধুনিকতা বলতে
সম-সাময়িকতা বা সমকালিনতা অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট সময়কালকে
বোঝায় না। যে অর্থে ভারতচন্দ্রের চেয়ে ঈশ্বরগুপ্ত আধুনিক, বা ঈশ্বরগুপ্তর চেয়ে মাইকেল, মাইকেলের চেয়ে বিহারিলাল বা বিহারিলালের চেয়ে
রবীন্দ্রনাথ আধুনিক, সেই অর্থে রবীন্দ্রনাথের
চেয়ে জীবনানন্দদাশরা আধুনিক নয়। আধুনিকতা বলতে একটা নতুন
অ্যাটিটিউডকে, একটা বিশেষ মর্জি বা ঝোঁককে
বোঝায়। বাংলা কবিতার আরো অনেক বাঁক-বদলের মতো এটাও একটা নতুন বাঁক-বদল। সাগরপার থেকে এদেশে
আমদানি করা এই মর্জির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল নগরকেন্দ্রিক ক্লান্তি ও নৈরাশ্যবোধ, আশ্রয়হীনতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ, প্রচলিত মূল্যবোধ বা সত্য-সুন্দর-মঙ্গল এসবকিছু নিয়েই ভয়ংকর সন্দেহ ও সংশয়, জৈব-প্রবৃত্তির প্রতি উদ্দাম বশ্যতা, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রুপ ও বিদ্রোহ
এইসব।
সুতরাং সুধীন্দ্রনাথদত্ত, বুদ্ধদেববসু, অমিয়চক্রবর্তী, জীবনানন্দদাশ, বিষ্ণুদে,
সমরসেন প্রমুখ রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিকরা কল্লোলের
কবিদের কাছে যা পেয়েছিলেন তা প্রধানত রবীন্দ্র-বিমুখতা।বাকিটা তাঁদের নিজস্ব।তাঁরা আবার অনেকেই ছিলেন
ইংরেজির শিক্ষক। তাদের হাত ধরে বাংলা-কবিতকে ভর্তি হতে হল ইংরেজি মিডিয়াম ইসকুলে।
ব্যাপারটা বিসদৃশ মনে হলেও ফলাফল খারাপ হল না। বহুকালের লালিত সংস্কার ত্যাগ করে
অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা কবিতা পাশ্চাত্য সাহিত্যের ঠাট-বাটকে আয়ত্ত্ব করতে
পেরেছিল। শুধু প্রতিমা নির্মাণ নয় তার মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠাও করতে পেরেছিল। বিশের
দশকের কবিদের যেমন ছিন কল্লোল-কালিকম-উত্তরা, ত্রিশের দশকের আধুনিকদের পূর্ণ প্রকাশ
ও বিকাশ কিন্তু পরিচয়-পূর্বাশা-বিচিত্রা-কবিতা-চতুরঙ্গ এইসব সাময়িক পত্রকে
কেন্দ্র করে।
রবীন্দ্রমোহ
তথা রবীন্দ্রউপনিবেশ থেকে মুক্তিকামী তিরিশের দশকের কবিদের মধ্যে যে সব
চিহ্নপ্রকরণ দেখা গেল তাতে বোখা যায় তাঁরা বাংলার নয় কলকাতারই কবি হতে চেয়েছিলেন ব্যতিক্রম
একমাত্র জীবনানন্দ। প্রাত্যহিক নগরজীবনের
খাঁচায় বন্দি থাকতে থাকতে তাঁদের কবিতায় ফুটে উঠল সেই জীবনের অত্যন্তরীণ সংকটকে
অনুভব করার ভাবভাবনা। যদিও সেই জীবনাভূতির প্রকাশটা হল লিরিক্যাল। সংসারের
বস্তুচৌতন্যে ভরপুর সেই কবিতার মধ্যে যেমন থাকল একদিকে ভোগসুখ আত্মপ্রসাদ তৃপ্তি ও শৌখিন
স্বপ্নবিলাস অন্যদিকে নিঃসঙ্গতা সংশয় হাহুতাশ ভাব ও নানান যন্ত্রণাবাচক শব্দ। রইল ট্রাম পিচের পথ আসফল্ট কংক্রিট জুতোর চাপা ফাঁপা
কড়া শব্দ
গূঢ় এষণা এবং ইংরেজি কবিতার প্রতিধ্বনি ও নানান
দুর্বোধ্য শব্দ যার জন্য পাঠককে বারবার অভিধান দেখতে হয়। কেউ অনুসরণ করলেন
ক্লাসিক্যাল রীতি কেউ আবার মৌখিক ভাষারীতি। কবিতার সংগীতনির্ভরতা ত্যাগ করে নতুন
কবিরা চেষ্টা করলেন ব্যক্তিরসে পূর্ণ চিত্রকল্প ও উপমার ব্যাবহারে একটা গদ্য-গন্ধী কাঠিন্য আনতে। সেখানে লক্ষ করা গেল এক অসাধারণ
বাকসংযম
ভাবসংযম ভাবগাম্ভীর্য স্বংসম্পূর্ণতা ও ঋজুতা। যদিও
কবিতা হল আলংকারিক এবং ছন্দ ও মিলের ঘনত্বে অভিব্যক্তির ভঙ্গিমায় এক অসাধারণ
পেলবতা এল।
No comments:
Post a Comment