Thursday, May 12, 2016


শিবের গাজন ও একটি সাহেবি-তত্ত্ব ০ মুরারি সিংহ 

 একদা এক বাঙালি কবি লিখেছিলেন - দিন যায় ক্ষণ যায় সময় কাহারো নয় / বেগে ধায় নাহি রহে স্থির, / সহায় সম্পদ বল, সকলি ঘুচায় কাল / আয়ু যেন শৈবালের নীর। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে নতুন সহস্রাব্দ তথা নতুন শতকের বয়স ইতিমধ্যে পনেরো বছর অতিক্রম করেছে। বঙ্গাব্দের হিসেবেও ১৪২২ শেষ হবার মুখে। অর্থাৎ আকাশে বাতাসে আরেকটি নতুন বছরের আগমন বার্তা ঘোষিত হয়ে গেছে। শুরুতেই হেমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা-অংশটি স্মরণ করার উদ্দেশ্য এটাই যে পাঠকের উপলদ্ধিতে নিয়ে আসা যে কী দ্রুত বয়ে চলেছে সময় নামক এক অদৃশ্য স্রোত। সে স্রোত পালটে দিচ্ছে অনেক কিছু। বেশভূষা খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে নানান সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্যান-ধারণা। কিন্তু প্রশ্ন হল এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ব্যক্তিগত পরিসরে আমাদের ভাবনা-চিন্তগুলো কতখানি ওলট-পালট হল তা কি আমরা কখনো খেয়াল করে দেখি!

একথা অস্বীকার করা যায় না সেই ১৯৪৭ এর ১৫ অগাস্ট এই দেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি পাততাড়ি গোটানোর সঙ্গে সঙ্গে ঔপনিবেশিক যুগের অবসান ঘটেছিল। সেই থেকেই আমরা এক নতুন কালখণ্ডের ভিতর প্রবেশ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও যেটা নির্মম সত্য তা হল আমদের চিন্তা-ভাবনার অনেকটাই এখনো সেই পুরোন প্রথায় বা একটা বাঁধা-গতেই আবর্তিত হয়ে চলেছে। পুরোন প্রথা মানে যার মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্য তথ কর্তৃত্ববাদ ব্রাহ্মণ্যবাদ রক্ষণশীলতা গোঁড়ামি সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে এবং যা নতুন সময়ের নতুন বিন্যাসগুলিকে মেনে নেবার পরিপন্থী হয়ে দেখা দিচ্ছে। অথচ সমাজ ও সভ্যতার নানা পরিসরে কেন্দ্রীয়শক্তিগুলি ক্রমশ পিছু হঠছে এবং সেখানে প্রান্তিকতার উত্থান ক্রমশ জোরদার হচ্ছে একথাটা বোঝার জন্যে কোনো তত্ত্বের কচকচনির মধ্যে না ঢুকে একটু চোখকান খোলা রাখাটাই যথেষ্ট। কিন্তু নতুন কিছু ভাবা বা তাকে গ্রহণ করা ব্যাপারে আমাদের অভ্যাসের মধ্যে খুব নীরবে একটা চিরকালীন ছুঁতমার্গ কাজ করে চলেছে। অথচ মজার কথা হল বঙ্গবাসী যে কখোনোই কেন্দ্রীয় আগ্রাসনকে পাত্তা দেয়নি – এটা ঐতিহাসিক সত্য। ভৌগোলিক দিক থেকে যেমন এই উপমহাদেশে বঙ্গভূমির অবস্থান এক প্রান্তে তেমনি আর্যাবর্তের নাগাল থেকে দূরে থাকায় তার উপর আর্য- সংস্কৃতির প্রভাবটাও অত্যন্ত ক্ষীণ। বরং বঙ্গ-সংস্কৃতির পরতে পরতে এমন অনেক কিছুই ছড়িয়ে আছে যা মূলধারার আর্যসমাজের কর্তাবাবুরা কখনোই মেনে নিতে পারেননি। পরিসর অল্প তাই কথা না বাড়িয়ে এ বিষয়ে শুধু একটি বিষয়ে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষন করতে চাইছি। সামনে চৈত্র-সংক্রান্তি। আর চৈত্র-সংক্রান্তি মানেই সারা বঙ্গভূমি জুড়ে শিবের-গাজন চড়কমেলা নীলের-পুজো্র রমরমা। অর্থাৎ বাঙালির জীবনে এক বিশাল পাব্বন। অথচ এই উৎসবকে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তা-ব্যক্তিরা চিরকাল লোক-উৎসব বলে কিছুটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই করে আসছে। কারণ তাদের চোখে এই উৎসব সমাজের নিম্ন- শ্রেণির জনগণের মধ্যে প্রচলিত। সুতরাং ছোটলোকেদের এই উৎসব নিয়ে ভদ্রলোকদের মাথা বেশি না ঘামালেও চলবে। বরং নিরাপদ দুরত্বে থেকে হাড়ি-ডোম-মুচি-বাগদি- ক্যায়ট ইত্যাদি-প্রভৃতিদের রঙ্গরস দেখো বাণ-ফোঁড়া দেখো আগুব-ঝাঁপ দেখো আর মেলাতে গিয়ে মজা করো জিলিপি-পাঁপড়ভাজা খাও আমোদ ও আনন্দের যতটুকু পাও চেটেপুঁটে শেষ করো। ব্যাস। তার বাইরে আর কিছু ভাবার দরকার নেই। সত্যিই কি তাই! এই গাজন পরব কী, একটা লোক-উৎসবকে নিয়ে কেন এত হই হই তার সঙ্গে গ্রামীণ জনগণের কীসের এত প্রাণের যোগ তা নিয়ে আর কিচ্ছু ভাবার নেই! আপাত দৃষ্টিতে হয়ত নেই। কারণ ব্রাহ্মণ্যবাদী তথা প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তার বাইরে নতুন কিছু ভাবতে যাওয়া মানেই তার অনেক ঝুঁকি। অনেক চেনা ছবি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবার সম্ভাবনা। কারণ এসবের মধ্যে এমন অনেক বিসদৃশ ব্যাপার-স্যাপার আছে যা প্রচলিত চিন্তা-ভাবনার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে। অথচ তা আমরা অবহমান অভ্যাসে অনায়াসে মেনে নিয়েছি। তবে হ্যাঁ। আমরা না দেখলেও ব্যাপারটা ভূয়োদর্শী হুতুম-প্যাঁচার নজর এড়ায়নি।কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর নকশার প্রায় শুরুতেই বাবু-কলকাতার গাজন নিয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন এই সুযোগে সেটা একবার দেখে নেওয়া যাক - ... “ক্রমে দিন ঘুনিয়ে এল, আজ বৈকালে কাঁটাঝাঁপ। আমাদের বাবুর চারপুরুষের বুড়ো মূল সন্ন্যাসী কানে বিল্বপত্র গুঁজে, হাতে এক মুঠো বিল্বপত্র নিয়ে, ধুঁকতে ধুঁকতে বৈঠকখানায় উপথিত হলো; সে নিজে কাওরা হলেও আজ শিবত্ব পেয়েছে, সুতরাং বাবু তারে নমস্কার করেন; মূল সন্ন্যাসী এক পা কাদা শুদ্ধ ধোব ফরাশের উপর দিয়ে বাবুর মাতায় আশীর্বাদী ফুল ছোঁয়ালেন, - বাবু তটস্থ”।

গাজন-পরব আসলে সমাজের নিচুস্তরে প্রচলিত মূর্খদের উৎসব যার প্রধান উপজীব্য হল মোটা দাগের হাসি-ঠাট্টা- মস্করা এবং অন্যান্য ছ্যাবলামি বা নোংরামি।এবং মজার কথা এসব কিছুই কিন্তু এই সব মানুষদের ধর্মীয় রীতি-নীতি পালনের অংশ-বিশেষ। যা তারা করে থাকে অত্যন্ত ভক্তি-অবনত চিত্তে এবং যা অন্তত তাদের কাছে পরম পবিত্র। এখন দেখুন ধর্মীয় আচরণ বলতে আমরা ভদ্র জনগণ যা বুঝি তার মধ্যে সাধারণত গমগমে থমথমে ভাবগম্ভীর একটা শুদ্ধ ব্যাপার থেকে যায়। অথচ আমরা যাদের ছোটোলোক বলে তাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করি সমাজের পিছিয়ে থাকা বা আমাদের সরকারি পরিভাষায় ব্যাক-ওয়ার্ড ক্লাসের সেই সব কালো বর্বর মানুষদের কাছেই সেই ধর্ম-চারণা হয়ে গেল দিল-খোলা হাসিঠাট্টা ও স্ফূর্তি করার মতো ব্যাপার-সাপার। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাণ-ফোঁড়া, কাঁটা-ঝাঁপ, আগুন-ঝাঁপ এসবের মতো অমানুষিক সব শারীরিক কৃচ্ছ্রসাধন। আবার এই গাজনের ক্রিয়াকর্মে যখন ছোটোলোকেদের পাশাপাশি ভদ্র-সন্তানেরাও অংশ নেয় তখন তারাও একই পঙক্তিতে বসে গলায় গলা মিলিয়ে মন্ত্র-উচ্চারণ করে শিবপুজো করে শোওয়া-বসা- ওঠা সবই চলে এক সঙ্গে। ভদ্র ঘরের বউ-ঝিরা, গাজন-সন্ন্যাসীর বেশে সেই সব নীচু শ্রেনির মানুষজন যাদের গলায় উপবীত এবং যারা কদিনের জন্য শিবগোত্রে দীক্ষি্‌ তাদের কাছে অবনত হয় তাদের প্রণাম করে তাদের হাত থেকে আশীর্বাদের ফুল-বেলপাতা সংগ্রহ করে। বন্ধুরা খেয়াল করুন, এরই একটা বিশ্বস্ত চিত্র সেই সময়ের হুতোমের নকশায় ধরা পড়েছে। সেই সঙ্গে ভাবুন প্রচলিত ছাঁদের গালে বিরাশি-সিক্কার থাপ্পড়-কষানো কী অসাধারণ মস্করার এক চমৎকার এই ছবি! মাপ করবেন পাঠক, যদিও আমি তত্ত্বের পক্ষপাতী নই তবু এই ঘটনাটিকেই এই সময়ের এক বিখ্যাত তত্ত্বের আলোয় অবলোকন করার লোভ সামলাতে পারছি না। তত্ত্বটির নাম কার্নিভ্যালাইজেশন। এটি মিখাইল বাখতিন-এর একটি তত্ত্ব। বাখতিন-সাহেবের জন্ম রাশিয়ায়। ১৯৬৫ সালে তাঁর এই তত্ত্ব প্রচারিত হয়।

এই তত্ত্বের সারমর্মটি বাঙালির পরিচিত জগতে এনে ব্যাখ্যা করলে যা বেরিয়ে আসে তা হল বিভিন্ন উপাখ্যানের কাঠামোয় এই রকম উৎসবের রূপ ধরে সমাজের নানান শ্রেণির ভিন্ন ভিন্ন পথচলার মধ্যে কত নতুন নতুন সংলাপের বিকাশ ঘটছে হাসি-ঠাট্টা-মস্করা এবং হইচই ও তামাশার মাধ্যমে যারা বদলে দিচ্ছে এতদিন কর্তার আসনে বসে থাকা প্রথাগত নানান সম্পর্ককে এবং সেইসব আখ্যানের শরীরে জন্ম নিচ্ছে কত বেজম্মা রীতির খোসমেজাজ। বাখতিনের তত্ত্বের আলোয় গাজন-মেলার সামাজিক প্রতিক্রিয়াগুলি যদি একত্র করা যায় তাহলে যে জিনিসগুলি বেরিয়ে আসে তা হল -

১। একটা উৎসবের মঞ্চে দুই বিপরীত মেরুর লোকজনকে এক জায়গায় মিলিয়ে ও মিশিয়ে দেওয়া এবং তাদের মধ্যে নতুন সংলাপ তৈরি করা;

 ২। গাজনমেলার মাধ্যমে সাময়িক ভাবে সামাজিক পদমর্যাদাগুলিকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া এবং উচ্চপদাধিকারীদের দ্বারা অসভ্যলোকেদের অসহ্য অভ্যাসগুলোকে সহ্য করে নেওয়া; ৩। গাজনমেলায় আপামর জনসাধারণ এবং আবালবৃদ্ধবনিতা এবং তথাকথিত স্বর্গ-নরক পাপ-পুণ্য ন্যায়-অন্যায় এইসব ধারণাগুলিকে ঘেঁটে চটকে দেওয়া যেগুলো অন্য সময়ে সাধারণত আলাদা আলাদা থাকে;

৪। গাজনমেলায় অন্যায় ও অপবিত্র আচার-আচরণ ঘটতেই থাকে এবং তার জন্য কোনো শাস্তির বিধান থাকে না। বরং সেগুলিকে ধর্মীয় উৎসবেরই অঙ্গ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়;

৫। প্রাতিষ্ঠানিক তথা আধিপত্যবাদী কণ্ঠস্বরগুলিকে সিংহাসনচ্যূত করে বিকল্প কণ্ঠস্বরের জেগে ওঠা। সামগ্রিক ভাবে এই গাজন-উৎসবে যেমন সমাজের নিচুতলার চোখ দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সমাজের উপর মহলকে দেখা যায় তেমনি গাজন-মেলা থেকে জাত জীবনের নানান অভিজ্ঞতার এইসব নাটকীয় বিকাশের মধ্যে দিয়ে সৃষ্টিশীল মনে এক নতুন সৃষ্টির অনুপ্রেরণাও তৈরি হয়।

মাননীয় পাঠক, আসুন এই উৎসবে আমরা মুক্তমনে সেই সৃষ্টি-তরঙ্গকে অনুভব করি। (মিলেমিশে - পত্রিকার এপ্রিল ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)

No comments:

Post a Comment