বাজার অর্থনীতি ও একুশ শতকের বাংলা কবিতা (পঞ্চম পর্ব) ০ মুরারি সিংহ
আটের দশকের শেষ-পর্ব বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে রইল পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির পতনের জন্য। শুরুটা অবশ্য হয়েছিল চিনে। তিয়েন-আন-মেন-স্কয়ারে। ১৯৮৯ সালে। একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাধারণ মানুষের দলবদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ আন্দোলন। চিনে সেই প্রয়াস ব্যর্থ হলেও অচিরেই তা ছড়িয়ে পড়ল পূর্ব-ইউরোপে। প্রথমে পোল্যান্ড, তারপর হাঙ্গেরি, পূর্ব-জার্মানি, বুলগেরিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া হয়ে শেষে রোমানিয়া। সব জায়গাতেই লৌহ-দৃঢ় কমিউনিস্ট শাসনের অবসান হল। কোথাও অহিংস উপায়ে কোথাও বা আবার তা হিংসার পথ বেছে নিল। এরপর একইভাবে গর্বাচেভের পেরেস্ত্রৈকা ও গ্লাসনস্তের প্রভাবে ১৯৯০ থেকে ভাঙতে শুরু করে ১৯৯১ সালের শেষ দিকের মধ্যে সম্পূর্ণ পতন ঘটল সোভিয়েত রাশিয়ার। তারপর আলবানিয়া ও যুগোশ্লাভিয়া মুক্ত হল কমিউনিস্ট শাসনের নাগপাশ থেকে। একইভাবে কাম্পুচিয়া, ইথিওপিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং দক্ষিণ ইয়েমেন থেকেও সমাজতন্ত্র বিদায় নিল।
তার মানে নব্বইয়ের দশক শুরুই হল ভয়ংকর এক পতন দিয়ে, যা বিশ্ব-রাজনীতির প্রেক্ষাপটটাকেই একেবারে বদলে দিল। কারণ এতদিন ধরে চলে আসছিল দুই-মেরু বিশ্বের ধারণা যার একমেরুতে ছিল সোভিয়েতের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির এবং অন্য-মেরুতে আমেরিকার নেতৃত্বে ধনতান্ত্রিক শিবির। মাঝখানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি। এখন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেখা দিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একাধিপত্যের সুযোগ। এই সূত্রে বাজার-অর্থনীতির রমরমা শুরু হল। বহুজাতিক পুঁজিপতিদের সামনে সারা বিশ্বে দখলদারি চালানো ও আধিপত্য বিস্তারের আর কোনো বাধা রইল না। আমরা আমাদের দুঃখ-কষ্ট নিবারণের জন্যে পেয়ে গেলাম বিশ্বায়ন নামক একটি নতুন ললিপপ। সেই সঙ্গে শিল্পায়ন, নগরায়ন এই রকম আরো কিছু শব্দ।
একই সময়ে খুব নিঃশব্দে আরেকটি ওলট-পালট ঘটে গেল। সেটা উচ্চ-প্রযুক্তির বিপ্লব। বিজ্ঞান ও কাগরির অত্যাধুনিক প্রয়োগে কমপিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার খোল-নলচে বদললে গেল। সারা বিশ্ব চলে এল হাতের মুঠোয়। পৃথিবীর নতুন নামকরণ হল ভুবন-গ্রাম।
নতুন প্রযুক্তি মুষ্ঠিমেয় গোষ্ঠী বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না, তা পৌঁছে গেল দূর থেকে দূরান্তরে। প্রত্যন্ত প্রদেশে। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গের বাম-সরকারও বিশ্বায়নকে মেনে নিল।দেখা গেল এই সময়ে এই রাজ্যের মাটিতে তাদের শাসন ও অপশাসন আরো দৃঢ়মুল হয়েছে।
এই আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে নব্বইয়ের বাংলা কবিতা তুমুলভাবে স্পন্দিত হল। বিস্তর নতুন ও ঝকঝকে ও তাজা ছেলেমেয়ে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করল। নতুন প্রজন্মের কবিদের ভাব-ভাবনা, আঙ্গিক-চর্চা ও নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উত্তর ঔপনিবেশিক ও উত্তরাধুনিক চিহ্নগুলি স্পষ্ট হতে থাকল। প্রথাগত যুক্তিজালকে ছিঁড়ে ফেলে সবকিছুকে এলোমেলো করে দেওয়া, জগৎ এবং জীবন সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও মিথগুলিকে অস্বীকার করে চিন্তার এক বহুমুখী ভুবনকে আবিষ্কার করা, ছন্দ ও শব্দ-প্রয়োগের ক্ষেত্রকে আরো ব্যাপক মাত্রায় নিয়ে গিয়ে বোধ ও বুদ্ধির নতুন নতুন পরিসর তৈরি করা। চিহ্ন, প্রতীক, চিত্রকল্প, বাকরীতি, উপস্থাপনা সবকিছুতেই নিজস্ব স্বাক্ষর লাগিয়ে দেওয়া। এসবই উজ্জ্বল হয়ে রইল অপসৃয়মাণ শতাব্দীর শেষ দশকের কবিতায়।
আশির দশকে বাংলা-কবিতার ভাষা-বদলের যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল কবিতার চেনা ছক থেকে বের করে আনার জন্যে সেখানে নানা জন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। ফলে বাংলা কবিতাকে তথাকথিত মূলধারার বাইরে চালিত করার একটা বীজতলা তৈরি হচ্ছিল। সেই প্রচেষ্টায় তুমুল গতি পেল পরের দশকের কবিতায়। নব্বইয়ের কবিদের আত্মপ্রকাশের প্রধান পীঠস্থান হল প্রতি পক্ষে প্রকাশিত কবিতার কাগজ কবিতাপাক্ষিক। তাঁদের প্রধান মদতদাতা হলেন কবিতাপাক্ষিকের কর্নধার প্রভাত চৌধুরী যিনি ষাটের দশকের ধ্বংসকালীন আন্দোলনের অন্যতম মুখ হলেও মাঝখানে বহুদিন কবিতায় ছিলেন না। নব্বইয়ের দশকে তিনি নতুন ও তুমুল উদ্দীপনা ও প্রাণশক্তি নিয়ে শুরু করলেন কবিতাপাক্ষিক। এই কাগজটির আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে বাংলা কবিতার অভিমুখটাই বদলে গেল। সেখানে যেমন অগ্রজ কবিদের কবিতা জায়গা পেল তেমনি ভিড় বাড়ল নতুন ভাবনা নিয়ে লিখতে আসা কবিদের, যাদের মধ্যে আবার একটা বড়ো অংশই প্রান্ত-বাংলা থেকে উঠে আসা। কবিতা পাক্ষিকের এই উন্মাদনা অনেককেই অনুপ্রাণিত করল এবং নানা প্রান্ত থেকে অনেক সমমনস্ক পত্রিকার প্রকাশ এবং কবিতার বই ছাপাও শুরু হল। উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে তাদের ছাপাই-বাঁধাই-অঙ্গসৌষ্ঠভও হল চোখে পড়ার মতো। বোঝা গেল তারা শহর কলকাতার সঙ্গে সমানে পাল্লা দিচ্ছে। বাংলা কবিতায় নয়ের দশককে অনায়াসে কবিতাপাক্ষিকের দশক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
কবিতার পাশাপাশি বাংলা গানের কথা ও সুরেও এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এল। এল জীবনমুখী গান ও বাংলা-ব্যান্ড। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সে-সব ভীষণ জনপ্রিয় হল। নতুনত্বের এই উন্মাদনার ঠেলায় পড়ে বাণিজ্যক ভাবে প্রকাশিত বহুল-প্রচারিত পত্রিকাও ভোল বদলে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ও আধিপত্য বজায় রাখতে এই সব নতুন কবিদের কবিতা ছাপতে বাধ্য হল। মজার কথা, সেই পত্রিকাগোষ্ঠীর থেকে প্রকাশিত মেয়েদের রূপচর্চার কাগজেও কবিতা বিভাগ খুলে সেখানে নতুন কবিদের জায়গা দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের সমূহ চেষ্টা করা হল। আধিপত্য জারি রাখার খেলায় অবশেষে অর্ধশতাব্দী পরে আবার পুনরুজ্জীবিত করা হল কৃত্তিবাস-কেও। যদিও আর পাঁচটা পত্রিকার সঙ্গে আলাদা করার মতো কোনো বৈশিষ্ট্য তার মধ্যে দেখা গেল না। আবার গঞ্জ ও মফসসল থেকে কবিতাপাক্ষিকের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তার সহযোগী হিসেবেও বেশ কিছু নতুন পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করল। সব মিলিয়ে অবশ্য আখেরে লাভ হল নতুন প্রজন্মের কবিদের। তারা অনেক বেশি করে পরিবেশিত এবং প্রচারিত হবার সুযোগ পেল।
No comments:
Post a Comment