কবিতার আপডেট – আপডেটেড কবিতা (১)
মুরারি সিংহ
মাননীয় পাঠক, একবার ভেবে দেখুন এই সমাজ-সংসারে আমাদের বেঁচে থাকাট অনেকটাই অভ্যাস-নির্ভর। সারাদিন আমরা যা করি যা ভাবি যা স্বপ্ন দেখি তার বেশিরভাগটাই এক রকম অভ্যাসেরই দাসত্বগিরি। অভ্যাসের দাসত্বগিরি করি বলেই নতুন ভাবনার মধ্যে বেঁচে থাকার দায়িত্ব কমে। বাঁচার পথ মসৃণ থাকে। আমরা অধিকাংশ সময়ে যা চিন্তা করি তা হয় সুখে থাকার চিন্তা অথবা দুশ্চিন্তা। সেই ছকে বাঁধা পথ ছেড়ে নতুন কিছু ভাবা বা করার মধ্যে একটা ঝুঁকির ব্যাপার থেকে যায়।আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেটা এড়িয়ে চলতে চাই। নিতান্ত শখ করে কেউ অভ্যাস থেকে বেরোতে চায় না। যতদিন ছকবাঁধা জীবনে বসবাস করাটা মানুষকে মানসিক তৃপ্তি দেয় ততদিন সে নিশ্চিন্ত। আবার যখন কেউ মনে করে বাঁধা গতে চলতে গিয়ে তার সামনে এক বিশাল অস্তিত্বের সংকট এসে হাজির হয়েছে তখন সে কতকটা বাধ্য হয়েই নতুন কিছু ভাবার চেষ্টা করে। নতুন কিছু করার সাহস দেখায়। মাঝে মাঝে এমন একটা সময় আসে যখন এই অস্তিত্বের সংকট একটা গোটা প্রজন্মকে গ্রাস করে তখন নতুন কিছু করা বা ভাবার একটা মিলিত প্রয়াস তৈরি হয়। একজন একরত্তি মানুষের লড়াই বড়োদের অনুকরণ ও অনুসরণ করে তার সঙ্গে নিজের ছেলেমানুষি মিশিয়ে আপন অস্তিত্ব জাহির করা। আবার যখনই সে শৈশব থেকে কৈশোরে বা কৈশোর থেকে যৌবনে পা রাখে তখন তার লড়াইটা বদলে যায়। তার তখন একটা স্বকীয়তার দরকার হয়। সেটা অর্জনের জন্যেই সে আপ্রাণ চেষ্ঠা করে। বাচ্ছা বয়সের এইটাই একটা বিশেষ দোষ বা গুণ। এভাবেই একটু একটু করে তার ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয় এবং একসময় নিজের ক্রমশই পেকে-ওঠা চিন্তা-ভাবনা ও কাজকর্মের ভিতর দিয়ে নিজস্বতার ছাপ রাখে। এবার তার সামনে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় ফেলে আসা জীবনের পুরোন অভ্যাস যা তার বেড়ে ওঠার পথে পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তখন সে তার থেকে মুক্তি পেতে চায়। কবিতার আপডেট প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছি কারণ আমরা যারা কবিতা লেখার চেষ্টা করি তারাও কেউ ভুঁইফোড় নই। কারণ তাদের এই সমাজের মধ্যেই লালিত-পালিত হতে হয়, বেড়ে উঠতে হয়। প্রথাগত শিক্ষালাভ করতে হয়। সুতরাং কবিতা সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণার বীজ এই সিস্টেমের মাধ্যমেই তাদের মধ্যে প্রোথিত হয়ে যায়। কবিতা নিয়ে ভাবতে গিয়ে বা কবিতা লিখতে গিয়ে তারাও প্রথম প্রথম সেই অভ্যাস থেকে বেরোতে পারেন না বা বেরোতে চান না। কিন্তু যখনই তার মনে হয় এই অভ্যাসের দাসত্ব করা তার নিজস্বতা অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তখনি সেই দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্যে তারও ভেতরটা হাঁস্ফাঁস করতে থাকে।এই ভাবেই যুগে যুগে বা দশকে দশকে একটু একটু করে কবিতাও বদলাতে থাকে। সুতরাং এই বদল এক নিরন্তর প্রবাহ। একদিন যারা তরুণ তুর্কি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন আজ তারা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন। আজ যারা বিদ্রোহ ও বিক্ষোভে সামিল হয়েছে একদিন তাদেরো বরণ করে নিতে হবে সাবেকি হবার তকমা। এবার প্রমথ চৌধুরীর ভাষায় বলি – “কাব্যরস নামক অমৃতে যে আমাদের অরুচি জন্মেছে, তার জন্য দায়ী এ যুগের স্কুল এবং তার মাস্টার। কাব্য পড়বার ও বোঝবার জিনিস, কিন্তু স্কুল মাস্টারের কাজ হচ্ছে বই পড়ানো ও বোঝানো। লেখক ও পাঠকের মধ্যে এখন স্কুলমাস্টার দণ্ডায়মান। এই মধ্যস্থদের কৃপায় আমাদের সঙ্গে কবির মনের মিলন দূরে থাক, চার চক্ষুর মিলও ঘটে না। স্কুলঘরে আমরা কাব্যের রূপ দেখতে পাই নে শুধু তার গুণ শুনি।” আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েরর পাঠ্যসূচি এবং পড়ানো ও বোঝানোর ব্যাপারগুলো সত্যি এত ব্যাকডেটেড ও গতানুগতিক যে তা কখনো আমাদের কবিতা-চর্চাকে যথাযথ পুষ্টি দিতে পারে না। বরং পিছিয়ে দেয়। সুতরাং যারা কবিতা লেখেন কবিতাকে আপডেট করাটা তাদের অবশ্য কর্তব্য।
No comments:
Post a Comment