কবিতার
আপডেট – আপডেটেড কবিতা (৭)
বৈদিক
স্তোত্র যারা রচনা করেছিল অনেকেই তাদের ঋষি-কবি বলে থাকেন। কিন্তু
বেদকে কেউ কাব্য বলেন না। বলা হয় ধর্মগ্রন্থ। যদিও সুললিত ছন্দ উপমা-অনুপ্রাস-রূপক
প্রভৃতি অলংকারের প্রয়োগ অন্ত্যমিল ধ্বনিমিল শ্বাস ও স্বরের ওঠানামা সবই সেখানে
পুরোমাত্রায় হাজির কিন্তু তবুও স্তোত্রগুলিকে কবিতা বলা হয়নি। সংহিতার অধিকাংশ
স্তোত্রে যা কিছু আছে সেগুলি মূলত নানান দেবতার স্তুতি এবং সেই দেবতাদের উদ্দেশ্যে
নিবেদিতা বহুবিধ কামনা-বাসনা। অনুমান করা অসম্ভব নয় এই সব দেবতাদের বেশিরভাগই আবার
আর্যদের নানান গোষ্ঠীর পূর্ব-পূরুষ যারা এককালে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী ছিল এবং
প্রবল পরাক্রমের সঙ্গে এদেশের অনার্য ভূমিপুত্রদের পরাজিত করে তাদের নগরগুলি ধ্বংস
করে নিজেদের দখল বিস্তার করেছিল। স্তোত্রগুলিতে সেইসব আর্যপুরুষদের আকৃতি সাজপোশাক
অলৌকিক কাজকর্ম এবং তাদের অসীম বীরত্ব এইসব কিছুকেই ফেনিয়ে ফেনিয়ে তুলে ধরা হয়েছে
যজ্ঞের কাজে ঋক বা মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে। প্রসঙ্গত
মনে রাখা দরকার সময়টা ছিল আজ থেকে ৩৫০০ বছর আগে। সভ্যতার সেই ঊষা-লগ্নে কবিতা তো
দূরের কথা সাহিত্যের কোনো রকম ধারণাই তৈরি হয়নি। তবে আর্যরা আধা-সভ্য যাযাবর
সম্প্রদায় হলেও তাদের ছিল একটি সুগঠিত এবং সুসংবদ্ধ ভাষা। যদিও কোনো লিপি ছিল না।
আর্য-ঋষিরা ছিল নিরক্ষর। বেদ ছিল শ্রুতি। শুনে শুনে মুখস্ত করতে হত। প্রজন্ম থেকে
প্রজন্মে। এদেশে দখল বিস্তারের পিছনে যেমন ছিল আর্যদের উন্নত সামরিক-শক্তি তেমনি
সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের পিছনে তাদের ভাষাশক্তির জোরও মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল। অনার্যদের
সঙ্গে যুদ্ধের বিবরণ সেই হিসেবে বেদকে আদিম যুদ্ধগীতিও বলা হয়। স্তোত্রগুলির মধ্যে
তাই কোনো মহত্ত্ব বা উদারতা নয় বরং সেখানে একটা যুদ্ধপ্রিয় জাতির যথেষ্ট নৃশংসতাই
প্রকাশ পেয়েছে। শক্তির গুণগান ও উপাসনার মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে অতুলনীয় দক্ষতার অধিকারী সেইসব
ঋষিকবিদের যাবতীয় বুদ্ধি আবেগ আত্মিক-উন্নতি আলোকপ্রাপ্তি ও সৌন্দর্যচেতনা।কবিত্বের
বাকিটুকু ঢাকা পড়েছে যজ্ঞের ধোঁয়ায়। অবশ্য
গোষ্ঠীপতিদের পাশাপাশি কিছু কিছু প্রাকৃতিক শক্তিকেও দেবতার আসনে বসানো হয়েছিল।
সেই রাত্রি ঊষা নদী প্রভৃতি কিছু সূক্তের বর্ণনার মধ্যে দেখা যাচ্ছে কবিসুলভ
বিস্ময়বোধ, মুগ্ধতা, কৌতূহল, জানার আগ্রহ ইত্যাদি। সূর্যোদয়ের সময় সূর্যের তেজ
দেখে তাকে বলা হচ্ছে স্থাবর ও জঙ্গম সব কিছুর আত্মা স্বরূপ (১.১১৫)। ঊষার বর্ণনা
প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে ঊষা যেন স্বর্গের দুহিতা, গৃহিণী যেমন সকলকে জাগিয়ে দেন ঊষাও
তেমনি জগতের সবাইকে জাগরিত করেন। নারী যেমন পুরুষের কাছে আসে কিংবা স্ত্রী যেমন
সুন্দর পোশাক পরে স্বামীর কাছে হেসে ফেলে ঊষাও তেমন(১.১২৪)।অন্য
জায়গায় ঊষাকে সদ্য স্নান করে উঠে আসা নারীর সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে(৫.৮০)। ভোরবেলা প্রসঙ্গে বলা হলা যেন কালো
রঙের গাভিগুলি লালরঙের গাভিগুলির সঙ্গে মিশে গেল(১০।৬১)।সপ্তম
মণ্ডলে(৭.১০৩)একটি মজার সূক্ত আছে যার দেবতার নাম মণ্ডুক।বর্ষাকালে
বৃষ্টির জল গায়ে পড়লে ব্যাঙেদের মধ্যে যে উল্লাস দেখা যায় এই সূক্তটি তারই বর্ণনা।
স্বভাবতই তা অন্যগুলির চেয়ে আলাদা এবং সেখানে যথেষ্ট কবিতার মজা আছে। এছাড়া
অক্ষ-সূক্ত(১০.৩৪)অন্ত্যেষ্টি-সূক্ত(১০.১৮)বিবাহ-সূক্ত(১০.৮৫)এগুলিতেও প্রচুর
কাব্যিক উপাদান আছে। অবশেষে বলব অরণ্যানী সূক্তর কথা(১০.১৪৬)যেখানে বনের গাছপালা
পশুপাখির ডাক কাঠ-কাটা বা ফল-মূলের কথা এসব থেকে এক অন্য বার্তা উঠে আসে, যার
সঙ্গে আর যাই হোক যাগ-যজ্ঞের কোনো সম্পর্ক নেই। এই হল ঋকবেদ সংহিতার
কবিতা-সংক্রান্ত আপডেট। সেখানে কোনো বিমূর্ত-ভাবনা নেই
ঠিকই তবে কবি-কল্পনার ক্রম-জাগরণ আছে।
No comments:
Post a Comment