ভাবীকাল ও রবীন্দ্রনাথ (২)
“রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়. আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;. দূর হতে
যদি দেখ চাহি. পারিবে না চিনিতে আমায়। হে বন্ধু, বিদায়”।-সময়ের
বদলের তালে পা মিলিয়ে নিজেকে বদলানো বা আপডেট করা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং
কাজটিও খুব সহজ নয়। তার জন্য যেটা দরকার তা হল নতুনকে মেনে নেওয়া ও গ্রহণ করার মতো
উদার মানসিকতা। আবার নতুনকে গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে পুরোনকে পুরোপুরি অস্বীকার
করা বা বাতিল করা। তবে নতুনকে স্বাগত জানানো মানে যেমন নিজের কবিতায় কিছু উটকো এবং
জীবন-বিমুখ উপাদানের ফুলঝুরি ফোটানো নয়, তেমনি পুরোনোকে আদর করার অর্থ যা নিজের কালকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে
নিজের চিন্তাভাবনা ও লেখালিখিতে হয়ত তারও কিছু আবেশ চিহ্ন বজায় রেখেছে। আমারা জানি
মানুষের মন আসলে বড়ো জটিল। একই সঙ্গে তার মধ্যে খাঁচার পাখি বাস বেঁধে থাকে আবার
বনের পাখিও ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে চায়। কার প্রতি কতটা অনুরাগ দেখাবো এই
টানাপোড়েনেই আমাদের বেলা কাটে। একটা সময় পরে দেখা যায় কারো চিন্তা-ভাবনা ও কলমের
আঁচড়ে পুরোন ধাঁচারই পাল্লা ভারী হয়ে তাকে ক্রমশই রক্ষণশীল ও গোঁড়া করে তুলেছে,
আবার কেউ কেউ সংস্কারমুক্ত মনে নতুনকে গ্রহণ করার ফলে নিজের কবিতাকে
সময়োপযোগী চলিষ্ণু ও ফুরুফুরে রাখতে সক্ষম হয়ছে।
যারা লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত তাদের একটা বড়ো লড়াই নিজের সঙ্গেই। বিশেষ করে
কবিতা লিখে যারা কিঞিত যশশ্বী হয়েছেন বা এখনকার মার্কেটিংযের ভাষায় যাদের কবিতার
বাজারে একটা ব্র্যান্ডনেম তৈরি হয়েছে তাদের সমস্যা আরো বেশি কারণ এইসব কবিরা নিজের
নিজের নির্মিত মূর্তির প্রতি বিশ্বস্ত থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। নিজের ভাবমূর্তির
মধ্যেই তাদের সৃষ্টিশীলতা তিলে তিলে আত্মহত্যা করে। ফলে বিশ-ত্রিশ বছর পরেও তারা
একই ধাঁচে ও একই উচ্চারণে কবিতা লিখে যান বা বলা ভালো নিজেদের পুরোন ইমেজের সঙ্গে
সাযুয্য রেখে আগের লেখাগুলোকেই রিরাইট করতে থাকেন। ভাবমূর্তি ভেঙে বেরিয়ে এসে তারা
নিজেদের আপডেট করতে পারেন না। সমস্ত ভাবনা-চিন্তার উৎসভূমি আদে যে মন তা নিজের
নিয়মেই সদা চঞ্চল। কিন্তু প্রথম থেকেই তাকে নানা ভাবে বশীভূত করার চেষ্টা করা হয়।
আসলে এই সংসারে ও সমাজে শিশুকাল থেকে যেভাবে আমরা বেড়ে উঠি তাতে নানান রীতি-নীতি
বিধি-নিষেধ আচার-বিচার-সংস্কার দিয়ে ক্রমশই আমাদের একটা মানসিক গড়ন তৈরি হয়ে যায়।
বেশিরভাগ সময় সেটাই আমাদের চালিত করে। অল্প বয়সে নানা হরমোন ও অনান্য
পারিপার্শ্বিক প্রভাবে মনের মধ্যে একটা বিদ্রোহী ভাব বজায় থাকে বটে তবে বয়স যত
বাড়ে সংসারের চাপ যত ভারী হয় ততই সেই আগুন নিস্তেজ হতে হতে আমাদের অজান্তেই কখন
যেন তা একেবারে নিভে যায়। তখন একটা কমফোর্ট জোন তৈরি করে মানুষ তার মধ্যেই
সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে চায়। অর্থৎ কিনা গতানুগতিকতাকে শিরোধার্য করে সে সংসারে
এক ভারবাহী পশুতে পরিণত হয় এবং তার সমস্ত স্থবিরতা নিয়ে কালস্রোতের একপাশে বৃদ্ধ
ব্যাঙের মতো ছিটকে পড়ে। এই কমফোর্ট জোন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে নতুন কিছু ভাবা ও
করার মধ্যে আছে নিত্য-নতুন অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দ আবার তার মধ্যেই থেকে যায় বিস্তর
ঝুঁকি। সেই পথে পা বাড়ানোর সাহস খুব কম মানুষেরই থাকে। আশ্চর্য ব্যতিক্রম
রবীন্দ্রনাথ। তিনি শেষ বয়স পর্যন্ত নিজেকে আপডেট করে গেছেন। আমরা জানি কবি বরাবরই
নতুনের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর কবিতায় আকছার দেখা যায় জীর্ণ-পুরাতনকে ভাসিয়ে দিয়ে
সবুজ ও কাঁচাকে বরণ করার আহ্বান। তা শোনার মতো কান কি আমাদের আছে? যদি থাকে করে তাহলে ওই শুনুন বহু যুগের থেকে রবীন্দ্রনাথ “আত্মপরীক্ষা
দেবার জন্যে যুবকদের মল্লযুদ্ধে আহ্বান” করছেন। অবশ্য এই মল্লযুদ্ধ মানে নতুনের “ছদ্মবেশধারী
পুরাতন মিথ্যা”-কে পরাস্ত করতে।
No comments:
Post a Comment