সাপ্তাহিক কবিতাপাক্ষিকের প্রথম সংখ্যার এডিটোরিয়াল নোটের
শেষ লাইনটিতে বলা হয়েছে – “প্রাণের
ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে শপথ করে কবিতাকে আপডেট করার
সংকল্প গ্রহণ করুন”। আহ্বানটি অবশ্যই
কবিতাপাক্ষিকের প্রাণ-পুরুষ প্রভাত চৌধুরীর। এটা আর বাংলা-কবিতার অনুরাগীদের জানতে
বাকি নেই যে ষাটের দশকের কবি প্রভাত চৌধুরী যখন নব্বইয়ের দশকে ফিনিক্স পাখির মতো
জেগে উঠে কবিতাপক্ষিক পত্রিকাটির সূচনা করলেন এবং দমবন্ধ বাংলা-কবিতাকে এক নতুন
দিশার সন্ধান দিলেন সেই থেকেই তিনি নতুন কবিদের কবিতাকে আপডেট করার আহ্বান জানিয়ে
আসছেন। অবশ্য একটু রহস্য করেই প্রভাতদা বলেন – যিনি কবিতা লেখেন তিনিই কবি আর কবি যা লেখেন তাই কবিতা । কবিদের একমাত্র
কাজ কবিতাকে আপডেট করা। প্রভাতদার এই প্রত্যয় নিয়ে অবশ্য আড়ালে-আপডালে বা খোলাখুলি
অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করতেও ছাড়েন না। করতেই পারেন। কারণ মত-প্রকাশের স্বাধীনতা
প্রত্যেকেরই আছে, আর কবিতায় বেদবাক্য বলে কিছু হয় না।
বিরুদ্ধবাদীদের অনেকেই বলেন কবিতা তো কবিতাই যার আবেদন চিরকালীন সুতরাং সেখানে
আপডেটেড বা ব্যাকডেটেট বলে কিছু হয় নাকি? ধন্দটা এইখানেই।
তবে ব্যাপারটা নিয়ে বিতর্ক করা অনর্থক তবে আলোচনা চলতেই পারে। যে কোনো সৃষ্টিকেই
চিরকালীন হতে গেলে প্রথমে তো তাকে নিজের কালকে ছুঁতে হবে, অর্থাৎ
সমকালীন হতে হবে। ভাষা-বিজ্ঞানীরা বলেন ভাষা আসলে নদীর মতো। সে শুধু বয়ে চলেছে।
তার নানান বাঁক, নানান হয়ে ওঠা। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে তাল
মিলিয়ে ভাষাও নিজেকে আপডেট করে নেয়। তাহলে কবিতাও তো সেই ভাষাকে অবলম্বন করেই।
তারও তো নানা বাঁক। পর্বে পর্বে তার নানান মেজাজ ও মর্জি অনেক মোচড় নানান ঝাঁকুনি।
কাল থেকে কালান্তরে কবিতার সেই বদলগুলোকে কি কেউ ইচ্ছা থাকলেও অস্বীকার বা
অগ্রাহ্য করতে পারেন! যে কোনো পরিবর্তনের
মূলেই কিন্তু এই কালের কারসাজি। কী দ্রুত গড়িয়ে চলেছে সময় নামক এক অদৃশ্য রথের
চাকা। সেই ধাবমান কাল দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে তার জাল ফেলে সবকিছুকে জড়িয়ে ধরে রথে
তুলে নিচ্ছে। একটু একটু করে পালটে দিচ্ছে অনেক কিছু। মানুষের বেশভূষা খাদ্যাভ্যাস
থেকে শুরু করে নানান সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রীতি-নীতি ধ্যান-ধারণা। এমনকি
দৈনন্দিন ব্যবহারের ভাষাটাও অহরহ পোশাক পালটাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল এই পরিবর্তনের
সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ব্যক্তিগত পরিসরে আমাদের ভাবনা-চিন্তগুলো কতখানি ওলট-পালট
হল তা কি আমরা কখনো খেয়াল করে দেখি!বা সেই পরিবর্তনকে আমরা আমাদের লেখালিখিতে তুলে
ধরি! তা যদি না করি তাহলে কেউ কেউ আমাদের কবিতাকে সেকেলে বলতেই পারেন। কবির অনুভব
দিয়ে বলি- “মৃত পদার্থের মধ্যে চিত্তকে অবরুদ্ধ করে তার মধ্যে বিরাজ করা আমাদের
দেশের লোকদের মধ্যে সর্বত্র লক্ষ্যগোচর হয়, এমন-কি আমাদের
দেশের যুবকদের মুখেও এর সমর্থন শোনা যায়। প্রত্যেক দেশের যুবকদের উপর ভার রয়েছে
সংসারের সত্যকে নূতন করে যাচাই করে নেওয়া, সংসারকে নূতন পথে
বহন করে নিয়ে যাওয়া, অসত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা।
প্রবীণ ও বিজ্ঞ যাঁরা তাঁরা সত্যের নিত্যনবীন বিকাশের অনুকূলতা করতে ভয় পান,
কিন্তু যুবকদের প্রতি ভার আছে তারা সত্যকে পরখ করে নেবে”। আমরা তো জানি জানি কবিতা কোনো যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে
অচল অটল জ্ঞান বিতরণের মতো জ্যাঠামশাই-সুলভ কাজকর্ম নয় বরং রাশভারী জ্ঞানের বাইরে
বেরিয়ে এসে কবিতা মানুষের অফুরন্ত প্রাণ-স্পন্দিত অনুভবের স্ফূরণ। অথচ বয়স যত বাড়ে
ততই নতুন নতুন উদ্দীপনা ও ইনফরমেশনের অভাবে অ্নুভূতির মালকোষগুলি ভোঁতা মেরে যেতে
চায়। তাই প্রতিটি সংবেদনশীল কবিকে চারপাশে গড়ে ওঠা সাম্প্রতিক সংলাপগুলির সঙ্গে
নিজস্ব অভিজ্ঞতা মিশিয়ে নিজেকে আপডেটেড রাখতে হয়। নিজের কবিতাবোধের সঙ্গে এই
কাল-সচেতনাতাকে মেশানোই কবির অন্যতম প্রধান কাজ। এবার প্রাণের ঠাকুরের কথাতেই বলি
- “কালের গোয়ালঘরের দরজা খোলা,
তার গোরুতে দুধ দেয় না, কিন্তু নটে গাছটি
মুড়িয়ে যায়”।
No comments:
Post a Comment