যখন
প্রথম ফুটেছে কলি 0 মুরারি সিংহ (৪)
আজকের কিশোর-কিশোরীদের একদিকে ঘর অন্যদিকে বিশ্ব। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে তাদের সংকটও
যথেষ্ট বেড়ে গেছে। সেই
সব অতিক্রম করেই তাদের তৈরি করতে হচ্ছে জীবনের চলার পথ। সুতরাং আমাদের বোঝা দরকার, আমরা সন্তানদের জন্ম দিয়েছি ঠিকই,
কিন্তু তাই বলে
আমাদের সন্তানেরা কখনোই তাদের বাবমায়ের পুনর্মুদ্রণ নয়। তারা অবিকল তাদের মতো। তারা নতুন সময়ের নতুন ফসল। তাদের বাঁচা মানে struggle for
existence বা কোনো রকমে
কায়ক্লেশে বেঁচে থাকা আর বাপ-ঠাকুর্দার বংশ-রক্ষা করা নয়। তাদের গন্তব্য তার চেয়ে অনেক বেশি। তাদের বাঁচা মানে মনুষ্যত্বের আরো বেশি
উন্মেষ। আরো বাঁচার বেশি
পরিসর নির্মাণ। জীবনের
আরো অনেক দেশ-মহাদেশের আবিষ্কার।
নানান
ভাষণে বা রচনায় যে আপ্তবাক্যটি প্রায়ই ব্যবহার করা হয় থাকে যে আজকে যাদের বয়স অল্প তারাই দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের পিতা। একটি শিশুর মধ্যে থাকে বিকাশের অনন্ত সম্ভাবনা। সুতরাং যথাযথ বেড়ে ওঠার জন্য, নিজেদের ঠিকঠাক গড়ে তোলার জন্য সেই শিশুকিশোরদের যথেষ্ট পরিসরের ব্যবস্থা করতে হবে। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় ও সামজিক অনুশাসনে ছোটোদের যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তা তাদের নিজেদের ভাবতে দেওয়া নয় বরং একটা নিদির্ষ্ট ফরম্যাটে তাদের জন্য আগে থেকেই ভেবে রাখা বা প্রোগ্রামিং করা বড়োদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা। বড়োদের সামগ্রিক প্রচেষ্টার অভিমুখ ছোটোদের নিজের পথে চলতে দেওয়া নয়, বরং বড়োদের পথে তাদের চালানো। এতে করে কচিকাঁচাদের না হচ্ছে উপকার, না হচ্ছে স্বপ্রকাশ। তাদের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে কর্তাভজা মানসিকতা।
আশার
কথা গত কয়েক দশকে এই মান্ধাতা-আমলের মানসিকতাতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কারণ এই উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ধ্যান-ধারনার মূলেও ব্যাপক নাড়া পড়েছে। সুদূর অতীত থেকে ঔপনিবেশিক সময় পর্যন্ত চলে আসা কেন্দ্রীয় আধিপত্যবাদের কুফলটা মানুষ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে। ফলে সংসার নামের প্রতিষ্ঠানটিও আর আগের মতো নেই। কারণ বিগত দিনগুলিতে সংসার ছিল একান্নবর্তী এবং পুরো-দস্তুর অভিভাবক-কেন্দ্রিক। সেখানে বাড়ির ছোটদের অধিকার ছিল একেবারেই সংকুচিত। বড়োদের কাছে তাদের মতামত বা দাবি-দাওয়ার কোনো মূল্যই ছিল না। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর দেশে এই ছবিটাই এখন অন্য রকমের। এখন যেমন সংসারের বহর কমেছে, সংসারের সদস্য বলতে মা-বাবা ও তাদের একটি-দুটি সন্তান, তেমনি সেখানে মনোযোগের কেন্দ্রটিও চলে গেছে ছোটোদের দখলে। সঙ্গে সঙ্গে কচি-কাঁচাদের পছন্দ ও মতামতের গুরুত্বও অনেক গুণে বেড়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের ব্যবস্থাগুলি যত উন্নত হচ্ছে, বাবা-মায়েরা অনেকেই চাইছেন সন্তানদের সঙ্গে নিজেদের communication gap কমাতে। আবার নিজেদের বাব-মা বা সংসারের বয়স্কদের প্রতি তাদের উপেক্ষা ও অবহেলা বাড়ছে। তার থেকেও কচিকাঁচাদের কাছে একটা ভুল বার্তা যাচ্ছে। ফলে সংসারে ভারসাম্যের একটা অভাব থেকেই যাচ্ছে।
আমরা যত তাড়াতাড়ি নিজেদের এই সংকটগুলি বুঝতে পারব, তাদের সমাধান করতে সচেষ্ট হব, সমাজ ও সংসারের পক্ষে ততই মঙ্গল।
তবে আমার কথাতেও এই যে এত উপদেশ বা পরামর্শ এসে যাচ্ছে তা
কিন্তু এই আলোচনার একটা দিশা নির্দেশ করার লক্ষ্যে। তা
কোনো আপ্তবাক্য নয়। কারো উপর
চাপিয়ে দেবের জন্যও নয়। প্রয়োজনীয়
মনে হলে তাকে ভেবে দেখবেন, নাহলে
সম্পূর্ণ উপেক্ষা করবেন।
শেষের কথা বলার আগে, অন্নদাশংকর রায় এই বয়স নিয়ে তাঁর ‘সৃষ্টির দিশা’ নামের এক লেখায় যে মূলাবান মতামতটি পেশ করেছেন প্রাসঙ্গিক মনে করে সেটি এখানে তুলে দিলাম -
‘‘যে মানুষ হয়, সে নিজেই নিজেকে গড়ে, সে সব প্রভাব অতিক্রম করে। যাকে মানুষ করা হয়, গড়ে তোলা হয়, স্পষ্ট প্রভাবিত করা হয় সে একটি পোষা বাঘের মতো স্বভাবভ্রষ্ট, সে
একটা breeding farm-এর ফসল, তাকে দিয়ে সমাজে শান্তিরক্ষা হয়, কিন্তু সৃষ্টিরক্ষা হয় না, সৃষ্টি যে কেবলি আঘাত খেয়ে কেবলি চেতনালাভ, কেবলি অপ্রত্যাশিতের সাক্ষাত, কেবলি প্রত্যাশিতের গাফিলি। যারা বলে ভাবী বংশধরদের আমরা উন্নত করবো তাদের শুভাকাঙ্ক্ষার তারিফ করতে হয়, কিন্তু তাদের সত্যিকারের কর্তব্য নিজেদেরি উন্নত হয়। ভাবী বংশধরেরা নিজেদের ভার নিজেরা নিতে পারবে এটুকু শ্রদ্ধা তাদের পরে থাক। সত্যকে পথের শেষে পাবার নয় যে বয়সের যারা শেষ অবধি গেছে তারাই পেয়েছে। পথের শেষ নেই, বয়সের শেষ নেই, সত্যকে পদে পদে পাবার, দিনে দিনে পাবার। শিশুর কাছে শিশুর অভিজ্ঞতাই সত্য, যতদিন না সে বৃদ্ধ হয়েছে ততদিন তার পক্ষে বৃদ্ধের অভিজ্ঞতা হচ্ছে অকালবৃদ্ধতা।’’
উপসংহার পর্বে এসে বলি, শৈশব বলি, কৈশোর বলি, অথবা যৌবন বা বার্ধক্য, সবই আসলে প্রকৃতিকে মেনে, প্রাকৃতিক নিয়মেই আসে যায়। কিন্তু মুশকিল হল বিঞ্জান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রকৃতির থেকেই আমরা দূরে চলে যাচ্ছি এবং প্রকৃতিকে অস্বীকার করে নাগরিক কৃত্রিমতার স্রোতে গা ভাসাতে চাইছি। ফলে সমাজ ও সংসার ক্রমবর্ধমান জটিলতার শিকার হচ্ছে। আজকের কম-বয়সীদের এসব নিয়ে আরো বেশি করে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। ভেবে দেখতে হবে বিঞ্জান, প্রযুক্তি, শিক্ষা
ও সভ্যতার চোখ-ধাঁধানো উন্নতির কথা এত ঢাক-ঢোল বাজিয়ে প্রচার করা সত্ত্বেও কেন আজো এত দারিদ্র্য, এত
গরিবি। কিছু মানুষের মধ্যে কেন আজো এত দখলদারির মানসিকতা। কেন এত মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধ
ও অশান্তি।
মনে
রাখতে হবে, নয়া-উপনিবেশবাদীদের দ্বারা পোষিত বাজার-সংস্কৃতি কিন্তু নানা অছিলা তথা ভোগবিলাসের অজস্র প্রলোভন দেখিয়ে এসবই ভুলিয়ে ও গুলিয়ে দিতে চাইছে। নতুন নতুন কায়দা-কানুন প্রয়োগ করে এই অদৃশ্য শক্তি চাইছে নতুন প্রজন্মকে বিপথে চালিত করতে, বিভ্রান্ত করতে। নিজেদের ভবিষ্যৎ কিছু চিন্তা বা কেরিয়ার গঠনের চেষ্টাকে কোনো রকম অবহেলা না করেও, আজকের ছেলেমেয়েদের এই সমস্ত ব্যাপার ভেবে দেখতে হবে। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে গড়ে তুলতে হবে আরো সুন্দর করে।
তাই
নতুন যৌবনের উন্মাদনায় জীবনকে যতই গোলাপি ও ফুরফুরে মনে হোক, সদ্য যুবক-যুবতিদের সামনে চ্যালেঞ্জ কিন্তু বিস্তর। ‘শাহবাগ স্কোয়ার’-এর আন্দোলন বা ‘হোক কলরব’-এর
মিছিল আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে তারা সে চ্যালেঞ্জ নিতে পিছ-পা নয়।
ঋণ-স্বীকার –
১।
রবীন্দ্রগান- কবিতাপাক্ষিক। ২০০২।
২।
তরুণের স্বপ্ন ০ তরুণের স্বপ্ন – সুভাষচন্দ্র বসু । নবম সংস্করণ, ১৩৬২। শ্রীগুরু লাইব্রেরি।
৩।
সৃষ্টির দিশা ০ তারুণ্য – অন্নদাশংকর রায়। দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৫৫। ডি এম লাইব্রেরি।
৪। Child Psychiatry & You –
Michail Buyanov (Eng. Trans. – Michail Burav), 1989, Mir Publishers
No comments:
Post a Comment