Wednesday, September 14, 2016

ভাবীকাল ও রবীন্দ্রনাথ (৭)

ভাবীকাল ও রবীন্দ্রনাথ (৭)
 

তাহলে রবীন্দ্র-প্রভাবকে অতিক্রম করার জন্য রবীন্দ্র-পরবর্তী আধুনিকেরা সরাসরি যে কাজটা করলেন তা হল আধুনিক ইউরোপের অনুসরণ। ‘কাব্যের মুক্তি’ নামের প্রবন্ধে সে যুগের পুরোধা কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়ে দিলেন- “বিশ্বের সেই আদিম উর্বরতা আজ আর নেই। এখন সারা ব্রহ্মাণ্ড খুঁজে কবিতার বীজ সংগ্রহ না করলে, কাব্যের কল্পতরু জন্মায় না”ওঃ! ভাবা যায়! কবিগুরুর নীরব অথচ সর্বব্যাপ্ত ছায়া থেকে বেরোনোর জন্যে কী বিপুল ও ব্যাপক সে বীজ খোঁজার আয়োজন। বোদলেয়র থেকে এলিয়ট ইয়েটস এজরা পাউন্ড র‍্যাবোঁ মালার্মে ভ্যালেরি কারো কাছেই আমাদের আধুনিকেরা ধারদেনা করতে কিছু বাকি রাখলেন না। পশ্চিমের থেকে গ্রহণ করাটা অবশ্য বাংলা কবিতার নতুন কোনো ঘটনা নয়।শুরুটা মাইকেলরও আগে সেই রঙ্গলাল বন্ধ্যাপাধ্যায় থেকে। তারপর মধুসূসদন-হেমচন্দ্র-নবীনসেন-বিহারিলাল-অক্ষয়বড়াল এমন কী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকের কবিতাতেই কম-বেশি ইউরোপের প্রভাব ছায়া ফেলেছে। সে ইউরোপ অবশ্য বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী ইউরোপ। সে ইউরোপ রেনেসাঁ-পর্বের ইউরোপ। A  thing of beauty is a joy for-ever-এর ইউরোপ। শেলি-কিটস-বাইরন-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-টেনিসন-ব্রাউনিং-সুইনবার্গ বা তারো আগে শেকসপিয়্-দান্তে-ভার্জিল-পেত্রার্ক এই সব মনীষীদের ইউরোপ। এইসব কবিদের এসথেটিকসের সঙ্গে ভারতীয়দের চিরায়ত সৌন্দর্য-ভাবনার কোনো মৌলিক বিরোধ ছিল না। কিন্তু গণ্ডগোলটা পাকালো সর্বনাশা বিশ্বযুদ্ধ। সেই ভয়ংকর মারণ-রণ সুসভ্য ইউরোপ সম্পর্কে বিশ্ববাসীর যাবতীয় ধ্যান-ধারণা ওলট-পালট করে দিল, সেই নেতিবাচক সংগ্রামের অনিবার্য প্রভাব পড়ল পশ্চিমের সাহিত্যে। বদলে গেল তার চাল-চলন। ইউরোপের প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে নিজের মতামতে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন- “য়ুরোপে ফরাসিবিপ্লব মানুষের চিত্তকে যে নাড়া দিয়েছিল সে ছিল বেড়া-ভাঙবার নাড়া এইজন্যে দেখতে দেখতে তখন সাহিত্যের আতিথেয়তা প্রকাশ পেয়েছিল বিশ্বজনীনরূপে সে যেন রসসৃষ্টির সার্বজনীন যজ্ঞ তার মধ্যে সকল দেশেরই আগন্তুক অবাধে আনন্দভোগের অধিকার পায় আমাদের সৌভাগ্য এই যে, ঠিক সেই সময়েই য়ুরোপের আহ্বান আমাদের কানে এসে পৌঁছল-তার মধ্যে ছিল সর্বমানবের মুক্তির বাণী আমাদের তো সাড়া দিতে দেরি হয় নি সেই আনন্দে আমাদের মনেও নবসৃষ্টির প্রেরণা এল সেই প্রেরণা আমাদেরও জাগ্রত মনকে পথনির্দেশ করলে বিশ্বের দিকে সহজেই মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে কেবল বিজ্ঞান নয়, সাহিত্যসম্পদও আপন উদ্ভবস্থানকে অতিক্রম করে সকল দেশ ও সকল কালের দিকে বিস্তারিত হয়; তার দাক্ষিণ্য যদি সীমাবদ্ধ হয়, যদি তাতে আতিথ্যধর্ম না থাকে, তবে স্বদেশের লোকের পক্ষে সে যতই উপভোগ্য হোক-না কেন, সে দরিদ্র আমরা নিশ্চিত জানি যে, যে ইংরাজি সাহিত্যকে আমরা পেয়েছি সে দরিদ্র নয়, তার সম্পত্তি স্বজাতিক লোহার সিন্ধুকে দলিলবদ্ধ হয়ে নেই ... ইংরেজি সাহিত্যে একদা আমরা বিদেশীরা যে নিঃসংকোচ আমন্ত্রণ পেয়েছিলুম আজ কি তা আর আছে...আধুনিক ইংরেজি কাব্যসাহিত্যে আমার প্রবেশাধিকার অত্যন্ত বাধাগ্রস্ত আমার এ কথার যদি কোনো ব্যাপক মূল্য থাকে তবে এই প্রমাণ হবে যে, এই সাহিত্যের অন্য নানা গুণ থাকতে পারে কিন্তু একটা গুণের অভাব আছে যাকে বলা যায় সার্বভৌমিকতা, যাতে করে বিদেশ থেকে আমিও একে অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিতে পারি ইংরেজের প্রাক্তন সাহিত্যকে তো আমরা আনন্দের সঙ্গে মেনে নিয়েছি, তার থেকে কেবল যে রস পেয়েছি তা নয়, জীবনের যাত্রাপথে আলো পেয়েছি তার প্রভাব আজও তো মন থেকে দূর হয় নি আজ দ্বাররুদ্ধ য়ুরোপের দুর্গমতা অনুভব করছি আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যে তার কঠোরতা আমার কাছে অনুদার বলে ঠেকে বিদ্রূপপরায়ণ বিশ্বাসহীনতার কঠিন জমিতে তার উপত্তি; তার মধ্যে এমন উদ্‌বৃত্ত দেখা যাচ্ছে না ঘরের বাইরে যার অকৃপণ আহ্বান এ সাহিত্যে বিশ্ব থেকে আপন হৃদয় প্রত্যাহরণ করে নিয়েছে; এর কাছে এমন বাণী পাই নে যা শুনে মনে করতে পারি যেন আমারই বাণী পাওয়া গেল চিরকালীন দৈববাণীরূপে” বুঝুন, পশ্চিমের এই সাহিত্য-ভাবনাই মডার্নিজিমের রূপ ধরে বাংলার তরুণ-তুর্কীদের মন ও মননে আছড়ে পড়ল। বিদেশি ইজমের ধাক্কা বাংলা কবিতায় সেই প্রথম। সব দেখে শুনে প্রাণের ঠাকুর প্রশ্ন তুললেন – ‘যে কবির কবিত্ব পরের চেহারা ধার করে বেড়ায়  সত্যকার আধুনিক হওয়া কি তার কর্ম!’  

No comments:

Post a Comment