যখন প্রথম ফুটেছে কলি (১)
মুরারি সিংহ
সেই
যে রবীন্দ্রনাথ একদা তাঁর একটি জনপ্রিয় গানে বলেছিলেন –
অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ্রমধুর হাওয়া -
দেখি
নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া।।
আজ
এই উত্তর-পঞ্চাশে কিশোরকাল নিয়ে লিখতে বসে এই গানটির কলিটিই আমার প্রথমে মনে এল। আমার মাথার ভিতর যে সার্চ-ইঞ্জিন আছে কেন জানি না তা এই মুহূর্তে টিন-এজ সম্পর্কে এর থেকে ভালো উপমা আর খুঁজে পাচ্ছে না।
অবশ্য
এই মতামত একেবারেই তার ব্যক্তিগত। কারণ বয়ঃসন্ধির এই সময়কে নিয়ে আরো অনেক চমৎকার কবিতা বা গান লেখা হয়েছে। যেমন ছাত্রদলের গান বা আঠারো বছর বয়স। সেই সব কবিতা বা গান নিজস্ব বিভায় ভাস্বর। সেদিক দিয়ে দেখলে রবি ঠাকুরের গানটি প্রত্যক্ষভাবে ঠিক নবযৌবন সম্পর্কিত নয়। সেটি প্রকৃতি পর্যায়ের ১৪৫ সংখ্যক গান। তবু গানটি শুনলে আমার কিশোরবেলার কথাই মনে পড়ে যায়। ওঃ! কী অসাধারণ সেই সৃষ্টি। যেমন কথা তেমনি তার সুর -
কোন
সাগরের পার হতে আনে
কোন সুদূরের ধন –
ভেসে যেতে চায় মন,
ফেলে যেতে চায় এই কিনারায় সব চাওয়া সব পাওয়া।।
পিছনে ঝরিছে ঝরো ঝরো জল, গুরু গুরু দেয়া ডাকে
মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণ ছিন্ন মেঘেরে ফাঁকে।
ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসি কান্নার ধন
ভেবে মরে মোর মন –
কোন সুরে আজ বাঁচিবে যন্ত্র, কী মন্ত্র হবে গাওয়া।।
গানটির
পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এক অনাবিল ভালোলাগা এবং ভালোবাসা। যা কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে সমস্ত মনপ্রাণ ভরিয়ে দেয়।
কিশোরবেলাও তো তাই।
আমার
মতে, এই
বয়েস হল মানবজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়। প্রকৃতিও চিরযৌবনা । সব সময়েই সে সবুজ ও চঞ্চল। বসন্তের সমাগমে ঝরে যায় পুরোন ও হলুদ পাতারা। সুতরাং সেখানে বার্ধক্যের কোনো জায়গা থাকে না। ঠিকঠাক বিচার করলে শেষ-পর্যন্ত কিশোরবেলাও তো সেই এক প্রাকৃতিক ঘটনাই।
বাংলায় বলা হয় বয়ঃসন্ধি-কাল। ইংরেজিতে তার নাম adolescence বা puberty।
প্রকৃতির
নিজস্ব নিয়ম মেনেই যথাসময়ে মানবশরীরে তার আগমন। ছোট্ট মানুষের দেহ-মনে তার অমোঘ বিকাশ ও অসীম প্রভাব প্রতিপত্তির বিস্তার। আহা কী মনোরম, কী চমৎকার এই বয়স। মনের ভিতর আঁকা হতে থাকে এক কল্পরাজ্য, এক
স্বপ্ন-মদির দেশ। যেখানে সবকিছুতেই সম্ভব-অসম্ভব নানান রঙের ছোঁয়া। কত হই-হুল্লড়, কত হাসি-গান-গল্প, কত মজা। কত রকমের সেই সব ছবি। ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায় তাদের রঙ। স্বপ্ন দেখা দু-চোখে চারপাশের সবকিছুকেই ভীষণ সুন্দর লাগে। আর যা যা সুন্দর সবকিছুকেই বড়ো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আদর করতে ইচ্ছে করে। তাদের কাছে পেতে, বা ছুঁয়ে-ছেনে দেখতে ইচ্ছে করে।
শৈশবের
পরেই আসে কৈশোর। এই যে শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছানে। মানে একটা সুন্দর পোশাক ছেড়ে আরেকটা সুন্দর পোশাক গায়ে চাপানো। তার ক্যানভাসে আঁকা হয়ে যায় এক দিকে সদ্য ফেলে আসা শৈশবের দামাল-দস্যিপনার স্মৃতি, অনাদিকে সামনে নতুন যৌবনের হাতছানি। চঞ্চল কিশোর থেকে গোঁফের রেখা দেখা দেওয়া সদ্য যুবক বা দু-বেণী দোলানো এক্কা-দোক্কা খেলা কিশোরী থেকে ডাগোর যুবতি হবার অপেক্ষা। সেখানেও কত অ্যাডভেঞ্চার, কত
রাগ-অনুরাগ, কত রোমাঞ্চ, কত উন্মোচন, কত শিহরণের ইঙ্গিত। বুকের ভিতর ছলাৎ ছলাৎ বয়ে চলা কত অচেনা অজানা অনুভূতি।
এই
যে খুব অল্প-সময়ের মধ্যে পর পর জীবনের দু-দুটো বড়ো সন্ধিক্ষণ। মানুষের জীবনে কৈশোর বড়ো বেশী জীবন্ত। বড়ো বেশি সবুজ। যখন সব বাধা-নিষেধ অগ্রাহ্য করে প্রাণ এক অফুরন্ত আকাশে ডানা মেলে উড়ান দিতে চায়।
আমাদের
মতো যাদের কাছ থেকে এই দুষ্টু-মিষ্টি সময়টা বহুদিন আগে টা-টা বাই-বাই করে চলে গেছে বহু দূরে, তাদের পক্ষে আবার সেই কৈশোর নিয়ে লেখালিখি করাটা খুব সহজ কাজ নয়। মনে পড়ে যাচ্ছে সুপরিচিত কিশোর-সাহিত্যিক দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার তাঁর একটি উপন্যাসের ভূমিকা লিখতে গিয়ে বলেছিলেন – ‘কিশোরদের উপন্যাসের অক্ষর লিখতে কালিটে নিতে হয় সবজে’। এখন যদিও প্রযুক্তি-নির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হাতে লেখার অভ্যাস কমে আসছে, কমছে কালির ব্যবহার। সব কাজই এখন অল্প আয়াসে ডিটিপি-পেজমেকারে করে নেওয়া যায়। তবে কিশোরদের জন্য প্রকাশিত প্রায় সমস্ত পত্র-পত্রিকা বা গল্প-উপন্যাসে রঙিন ছবি ও রেখার কাজ লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে গেছে, উদ্দেশ্য একটাই, সেগুলিকে কিশোরদের উপযোগী করে পরিবেশন করে তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা। আসল কথা কিশোরদের কথা ভাবতে বা লিখতে হলে নিজের মনটাকে সবুজ ও তরতাজা রাখতে পারা চাই।
এই
প্রসঙ্গে আবার রবি ঠাকুরের কবিতার কথা উল্লেখ না করে পারা যায় না। সেই বিখ্যাত কবিতাটি, যেখানে কবি সেই নতুন যৌবনকেই আহ্বান করেছেন।–‘আয়
রে সবুজ, আয় রে আমার কাঁচা আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’। মনে পড়ে যায় বিদ্রোহী-কবি হিসেবে পরিচিত নজরুলের সেই আগল-ভাঙার ডাক বা আঠারো বছরের জয়ধ্বনি দিয়ে কিশোর-কবি হিসেবে চিহ্নিত সুকান্ত ভট্টাচার্যের দুরন্ত কামনা এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।
এতো গেল কবিদের উপলব্ধির কথা।
কবিরা
একটু বেশি বেশি কল্পনা-প্রবণ। কবিরা নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে ইতিবাচক ছবি উপহার দিলেও বয়স্কদের ধ্যান-ধারনা কিন্তু অন্য রকম। কম বয়সীদের সম্পর্কে বেশিরভাগ সময়েই অগ্রজরা একটু নাকউঁচু মনোভাব পোষণ করেন। তাঁদের কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা যে বার্তাগুলি ছড়িয়ে দেয় তা এই রকম- আজকালকার ছেলেমেয়েরা বড্ড বেয়ারা। তারা বড়োদের কথা শোনে না, বড়োদের মানে না। তারা সব সময় মত্ত। যেন সাপের পাঁচ-পা দেখেছে। এক কথায় তারা সব উচ্ছন্নে গেছে। গোল্লায় গেছে।
আর
সব চেয়ে মজার কথা এই যে, আজ যাঁরা তরুণ-তুর্কিদের সম্পর্কে এই মতামত ব্যক্ত করছেন, একদিন তাঁদের বয়স যখন কম ছিল, সেদিন তাঁদের অগ্রজ বা অভিভাবকরাও কিন্তু নবীনদের অর্থাৎ আজকের মন্তব্যকারীদের সম্পর্কে এই রকম মনোভাবই দেখিয়েছিলেন।
তার
মানে সময় বদল হলেও ধারা বদলায়নি। প্রথা বদলায় না। চিন্তা-ভাবনা বদলায় না। শুধু মুখগুলো বদলে যায়। সেই আদিকাল থেকেই আমদের সমাজ এই রীতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই যে গোল্লায় যাওয়া, অধঃপাতে যাওয়া, বারোটা বেজে যাওয়া, এঁচোড়ে পাকা, রেঙাটে, বখাটে, ফোর-টোয়েন্টি, চার-শো বিশ, ফক্কড়, ডেঁপো, ফচকে, ত্যাঁদোড়, অকাল-কুষ্মাণ্ড ইত্যাদি-প্রভৃতি বিশেষণের প্রয়োগ, তারা চিরকালই একই রকম রয়ে গেছে।
https://sondajal.blogspot.in/2016/09/0_15.html
No comments:
Post a Comment