যখন প্রথম ফুটেছে কলি 0 মুরারি সিংহ
(৩)
কিন্তু
যৌবনের বৈশিষ্ট্যই হল বাড়াবাড়ি। সেটা নিয়েই বড়োদের মাথাব্যথা। চিরকেলে প্রথা মেনে বয়স্করা সমাজে স্থবিরতন্ত্র কায়েম করতে চায়। অতঃপর প্রবীণ বনাম নবীনের এই
লড়াই চলতেই থাকে। ছোটদের সমস্যা নিয়ে বড়োদের মাথা ঘামানোর সময় হ্য় না।
এসবের কারণে নিন্দা-মন্দ করার জন্য আসামি সাজিয়ে শুধুমাত্র বিশেষ কিছু মানুষের দিকে আঙুল তুলে লাভ নেই। কাঠগড়ায় যদি কাউকে দাঁড় করাতেই হয় তাহলে তা হল মান্ধাতা-গন্ধী সমাজের প্রচলিত রীতি-নীতি। সামজিক হতে চাওয়া মানুষ-জনের চিরকেলে বদভ্যাসগুলি।
আবার
বলছি, এখানেই আবার যত মজা তত রহস্য। মানুষের মনের গতি এমনি সেই প্রাচীন প্রবাদটাই সত্য হয়ে ওঠে। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। আজ যে ছোটোরা তাদের অগ্রজদের বাঁকা চোখে দেখছে, তারা যখন বড়ো হবে তখন তারাও ভুল মেরে বসবে যে তারা একদিন ছোটো ছিল। নিজেদের
পরবর্তী প্রজন্ম সম্পর্কে তখন তাদের মনোভাবও হয়ে যাবে আজকের বড়োদের মতো একই রকম উন্নাসিক।
ছোটোদের
পক্ষ নিয়ে দেখলে, এমনিতেই খুব অল্পসময়ের মধ্যে দু-দুটো বয়ঃসন্ধির কারণে নব্য যুবক-যুবতিদের শরীরে ও মনে যেসব প্রাকৃতিক পরিবর্তনের উথাল-পাতাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে, তার ধাক্কায় এই বয়সের ছেলেমেয়েদের অবস্থাটা বেশ বেসামাল হয়ে থাকে। তার উপর পড়াশোনার প্রবল চাপ এবং সমাজ ও পরিবারের নানা রকম অনুশাসন। ফলে বেশির ভাগ সময়ে স্বাভাবিক ভাবে এদের মন হয়ে ওঠে বেপরোয়া ও বিদ্রোহী। তারা হতে চায় ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম ও ঝর্নার মতো চঞ্চল। তারা আদতে বনের পাখি। বাধাহীন আকাশে মনের আনন্দে ডানা মিলে দিতেই তাদের আগ্রহ বেশি। কিন্তু প্রতিষ্ঠান তাদের বশ মানিয়ে খাঁচার পাখি বানাতে চায়।
ছোটোদের
অভিজ্ঞতা কম। কাজ করতে গিয়ে তারা ভুল করতেই পারে। মাঝে মাঝে পদঃস্খলন হতে পারে। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিজেরাই সেই ভুল সংশোধন করে মাথা উঁচু করে ফিরে এসেছে লড়াইয়ের ময়দানে। নিজেদের এই সংগ্রামে তারা বড়োদের পাশে পেতে চায়। তাদের কাছ থেকে আশা করে সহানুভূতি। কখনোই নিন্দা-মন্দ বা সমালোচনা নয়।
প্রসঙ্গত
স্মরণ করুন নেতাজি সুভাষচন্দ্র তাঁর ‘তরুণের স্বপ্ন’-তে যুবসমাজের এই তোলপাড় ও ওঠাপড়াকে কী সুন্দর করে বর্ণনা করে লিখেছিলেন-
‘‘অনন্ত আশা, অসীম উৎসাহ, অপরিমেয় তেজ ও অদম্য সাহস লইয়া আমরা আসিয়াছি – তাই আমাদের জীবনের স্রোত কেহ রোধ করিতে পারিবে না। অবিশ্বাস ও নৈরাশ্যের পর্বতরাজি সম্মগখে আসিয়া দাঁড়াক অথবা সমবেত মনুষ্য-জাতির প্রতিকূল শক্তি আমাদের আক্রমণ করুক, - আমাদের আনন্দময়ী গতি চিরকাল অক্ষুণ্ণই থাকিবে।
আমাদের
একটা ধর্ম আছে- সেই ধর্মই আমরা অনুসরণ করি। যাহা নূতন, যাহা সরস, যাহা অনাস্বাদিত – তাহারই উপাসক আমরা। আমরা আনিয়া দিই পুরাতনের মধ্যে নূতনকে, জড়ের মধ্যে চঞ্চলকে, প্রবীণের মধ্যে নবীনকে এবং বন্ধনের মধ্যা অসীমকে। আমরা অতীত ইতিহাসলব্ধ অভিজ্ঞতা সব সমত মানিতে প্রস্তুত নই। আমরা অনন্ত পথের যাত্রী বটে কিন্তু আমরা অচেনা পথই ভালোবাসি – অজানা ভবিশ্যৎই আমাদের নিকট অত্যন্ত প্রিয়। আমরা চাই “the right to make blunders” অর্থাৎ ‘ভুল করিবার অধিকার’। তাই আমাদের স্বভাবের প্রতি সকলের সহানুভূতি নাই, আমরা অনেকের নকট সৃষ্টিছাড়া ও লক্ষ্মীছাড়া।
ইহাতেই
আমাদের আনন্দ; এখানেই আমাদের গর্ব। যৌবন বর্ষাকালে সর্বদেশে সৃষ্টিছাড়া ও লক্ষ্মীছাড়া। অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার উন্মাদনায় আমরা ছুটিয়া চলি – বিজ্ঞের উপদেশ শুনিবার পর্যন্ত অবসর আমাদের নাই। ভুল করি, ভ্রমে পড়ি, আছাড় খাই, কিন্তু কিছিতেই আমরা উৎসাহ হারাই না বা পশ্চাদপদ হই না। আমাদের তাণ্ডবলীলার অন্ত নাই, কারণ – আমরা অবিরাম গতি।
আমরাই
দেশে দেশে মুক্তির ইতিহাস রচনা করিয়া থাকি। আমরা শান্তির জল ছিটাইতে আসি নাই। বিবাদ সৃষ্টি করিতে, সংগ্রামের সংবাদ দিতে, প্রলয়ের সূচনা করিতে আমরা আসিয়া থাকি। যেখানে বন্ধন, যেখানে গোঁড়ামি, যেখানে কুসংস্কার, যেখানে
সংকীর্ণতা – সেখানেই আমরা কুঠার হস্তে উপস্থিত হই। আমাদের একমাত্র ব্যবসায় মুক্তির পথ চিরকাল কণ্টকশূনা রাখা, যেন সেপথ দিয়া মুক্তির সেনা অবলীলায় গমনাগমন করিতে পারে।’’
এতক্ষণ
ছোটোদের পক্ষ নিয়ে এত কথা বললাম বলে কেউ যেন ভেবে না বসেন ছোটোদের বড়ো করার সব দায়িত্ব একা বড়োদের। বড়োদের প্রতি ব্যবহারের বিষয়ে ছোটোদের মধ্যেও আরো সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার । কারণ আলোচনার শুরুর দিকে উদ্ধৃত ছোটোদের সম্পর্কে করা বড়োদের মন্তব্যগুলোরো কিছু বাস্তবতা থেকে যায়। বয়স্কদের
সম্পর্কে ছেলেছোকরাদের টীকা-টিপ্পনিগুলিও সবসময় শ্রুতি-সুখকর হয় না। আড়ালে-আবডালে বড়োদের সম্পর্কে ছোটোদের মধ্যেও বুড়ো-হাবড়া, সেকেলে-অচল, বাতিল, old fools, ঘাটের মড়া এইসব বিশেষণও খুব চলে। নিয়ম-ভাঙার প্রতিযোগিতায় সময়ে সময়ে ছোটোদের মধ্যে একটা কালাপাহাড়ি মনোভাব কাজ করে। এখানেও ছোটোদের খুব একটা দোষ নেই। কারণ তাদের বয়স অল্প। সমালোচনার মুখে মাথা গরম হতেই পারে।
তবে
ছানাপোনাদেরও বুঝতে হবে যতই সমালোচনা করুক, বা যতই কুকথা বলুক, বড়োরা কিন্তু তাদের শত্রু নয়। নেহাৎ কিছু প্রাচীন প্রথা ও সংস্কারের ঝোঁকেই তাদের মুখ থেকে মন্দ কথা বেরিয়ে আসে। বড়োরা আদতে তাদের ভালোই চায়। সুতরাং মাথা গরম করলে চলবে না। বড়োরা জ্ঞান দিতে বা উপদেশ দিতে ভালোবাসে। তাতে অনেক সুপরামর্শও থাকে। সুতরাং অধৈর্য হলে চলবে না, যারা বলতে চাইছে তাদের বলতে দিতে হবে। মন দিয়ে তাদের কথা শুনতে হবে। তবে শোনা মানেই মেনে চলা নয়। তাই কোনো ব্যাপারে যে যা বলবে তা শুনে নিয়ে যখন কাজ করতে যাবে তখন নিজের বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে যেটা ভালো মনে হবে সেটাই করবে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে পারার মতো করে নিজের ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করতে হবে। তা করতে গিয়ে যদি বড়োদের সঙ্গে কোনো মতপার্থক্য হয়, তাহলে নিজের সিদ্ধান্তর পক্ষের যুক্তিগুলিকে সুষ্ঠভাবে তাদের সামনে পেশ করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে। নিজের সপক্ষে আনার চেষ্টা করতে হবে। দরকার হলে তাদের যুক্তিগুলিকেও গুরুত্ব দিতে হবে এবং সময়ে সময়ে মনমতো না হলেও বড়োদের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। মতান্তর কখনো যেন মনান্তরের পর্যায়ে না চলে যায়।
এই
সমাজ ও সংসারে যখন আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এবং সেখানেই যখন আমাদের বসবাস করতে হবে, তখন পছন্দ হোক বা না হোক তার কিছু নিয়ম-কানুন আমাদের মেনে নিতেই হয়। পাঁচজনকে নিয়ে মিলেমিশে পথ চলার নামই সংসার। সংসারে প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা। স্বতন্ত্র। সেখানে প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। থাকবে আলাদা আলাদা মেজাজ, স্ফূর্তি ও
মুদ্রাদোষ। আর যেটা বিশেষ করে বলার তা
হল সব মানুষেরই থাকে
নিজস্ব অহং ও তাকে তৃপ্ত করার বাসনা। সুতরাং একই সঙ্গে থাকবে সংঘাত। কিন্তু কলহ দিয়ে তো সমাজ-সংসারে শান্তি বজায় থাকে সুতরাং
বিবির্তনের স্বাভাবিক নিয়মেই থাকবে
আড়ির সঙ্গে ভাব।
ভাব মানে সমন্বয়, ভাব মানে সমঝোতা। ভাব মানে মানিয়ে নেওয়া।
অন্যদের
সঙ্গে এই মানিয়ে নিতে পারাটা একটা আর্ট। কারণ যে মানিয়ে নিবে তারও আছে আলাদা ইগো। সেও চাইবে নিজের
অহংকে তৃপ্ত করবে। কিন্তু তাতে তো সংঘাত চলতেই থাকবে, কোনোদিনই শান্তি আসবে না।
অতএব, মানিয়ে নেবার অন্যতম কৌশল হল ্তার জন্য নিজের অহংকে গোপন করতেও জানতে হবে ও
শিখতে হবে। এই অহংকে গোপন করতে জানার মধ্যেও কিন্ত আলাদা সুখ ও আনন্দ আছে। কারণ
তাতে নিজের কার্যসিদ্ধি হয়।
এই জন্যেই ওই যে আগে
বললাম না, অন্যদের
সঙ্গে এই মানিয়ে নিতে পারাটাও একটা আর্ট।
মনে
রাখবে, ভিড়ের মধ্যে থাকবে ঠিকই তবে ভিড়ের মানুষ হিসেবে নয়। ভিড়ের মধ্যে মিশে থেকেও, জীবন সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভিঙ্গি তৈরি করে, সবার কাছে আপন মতামত পেশ করে, শ্বাস-প্রশ্বাস নেবার নিজস্ব পরিসর তৈরি করেই, বেঁচে থাকার জন্য নিজস্ব পৃথিবী বানিয়ে নেওয়া যায়। নিজের ভিতরের মানুষটিকে সর্বাঙ্গীনভাবে বিকশিত করা যায়।
এবার
নিশ্চয় পরিষ্কার হল যে এই লেখার মূল উদ্দেশ্য নবীন বনাম প্রবীণ বলে তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগানো বা কলহের আবহ তৈরি করা নয়। আলোচনার আসল কথাটা সমালোচনা বা সংঘাত নয়। বরং
এক্ষেত্রে যেটা দরকার সেটাই বোঝানো, তা হল দুই প্রজন্মের মধ্যে সমন্বয়, সহযোগিতা ও উপযুক্ত বোঝাপড়া।
সেই সঙ্গে এটাও বলা যে, এ ব্যাপারে বড়োদেরই এগিয়ে এসে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। ঐতিহ্যের ব্যাপারেই যদি জোর দেওয়া হয় তাহলে বড়োদের মনে রাখতে হবে যে, যে সমুদ্র মন্থন করে গরল উঠেছিল, সেই মন্থনের শেষেই পাওয়া গিয়েছিল অমৃত। সুতরাং মতের যতই গরমিল হোক, ছোটোদের নিয়ম মানতে না-চাওয়া নিয়ে অযথা ভয় বা হতাশার কিছু নেই। ছোটোদের ব্যাপারে বড়োদের ইতিবাচক মানসিকতা রাখা চাই।
বড়োদের বুঝতে হবে পুরোন প্রজন্মের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ফারাক কখনোই ঘুচবে না। কারণ সময় কখনোই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। আর সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চারপাশে সব কিছুই বদলাতে থাকে। সাম্প্রতিক কালে উচ্চ-প্রযুক্তির মহাবিপ্লবের ফলে এই পরিবর্তনের গতি যেমন অসম্ভব রকমে বেড়ে গেছে পরিবর্তনের মাত্রাও তেমনি ছড়িয়ে গেছে নানান অভিমুখে। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে যারা কিশোর ছিলেন তাদের চেয়ে আজকের কিশোর-কিশোরীদের এই বিশ্বায়নের পৃথিবীতে অনেক বেশি তথ্য ও জ্ঞানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, নিজেদের মতো করে তার মোকাবিলাও করতে হচ্ছে। তার জন্য আজকের ছানাপোনাদের দ্রুত আয়ত্ব করতে হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার।
No comments:
Post a Comment