Tuesday, September 6, 2016

ভাবীকাল ও রবীন্দ্রনাথ (৬)

ভাবীকাল ও রবীন্দ্রনাথ (৬) 


আমি রবীন্দ্রনাথকে নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করি, এবং এই ভেবে আশ্চর্য হই, সমকালীনতার সমস্ত পরিসরে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েও তিনি কিন্তু আধুনিকতার প্রতি কোনো রকম পক্ষপাত দেখালেন না। বরং নানা সময়ে তিনি পশ্চিমের এই উৎপাতটিকে তীব্র বিদ্রুপ ও উপহাস করলেন। কিন্তু সাগরপার থেকে আসা এই নতুন ঢেউটির প্রতি চির-নতুনের পূজারি রবীন্দ্রনাথ এত বিরূপতা কেন। তবে কি তিনি সেই নতুন প্রবণতার প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে সমকালীনতা ও আধুনিকতা এক মনে হলেও ব্যাপারটা কিন্তু আদৌ তা ছিল না। তাঁর ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’-র ভূমিকাতে বুদ্ধদেব বসু অবশ্য ‘সাম্প্রতিক কাব্যে’ বাক্যবন্ধটি ব্যবহার করেছেন যদিও শুধুমাত্র সাম্প্রতিক কালের মধ্যেই বাংলার আধুনিক কাব্য  সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েনি। তার একতা ভাব-জগৎও ছিল। আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’-সংকলনের ভূমিকা লিখতে গিয়ে আইয়ুব সাহেব তো স্পষ্ট করেই বলেছেন –“কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ-পরবর্তী এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত, অন্তত মুক্তিপ্রয়াসী, কাব্যকেই আমরা আধুমিক কাব্য বলে গণ্য করেছি”। যুগের ধর্ম মেনে রবীন্দ্র-বিরোধিতা থাকতেই পারে, তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু এখানে রবীন্দ্রনাথ মানে কিন্তু একজন ব্যক্তি-মানুষ নন, রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষ নামক এক বিশাল উপমহাদেশের আত্মা-স্বরূপ। সুতরাং রবীন্দ্র-বিরোধিতা মানে এক কথায় সেই ভারতীয় ঐতিহ্যেরও বিরোধিতা করা। বুদ্ধদেব বসু অবশ্য জানিয়ে দিলেন “এই আধুনিক কবিতা এমন কোনো পদার্থ নয় যাকে কোনো চিহ্ন দ্বারা অবিকলভাবে সনাক্ত করা যায়। একে বলা যেতে পারে বিদ্রোহের, প্রতিবাদের কবিতা, সংশয়ের, ক্লান্তির, সন্ধানের, আবার এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বিস্ময়ের জাগরণ, জীবনের আনন্দ, বিশ্ববিধানে আস্থাবান চিত্তবৃত্তি। আশা আর নৈরাশ্য, অন্তর্মুখিতা বা বহির্মুখিতা, সামাজিক জীবনের সংগ্রাম আর আত্মিক জীবনের তৃষ্ণা, এই সবগুলো ধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে শুধু ভিন্ন-ভিন্ন কবিতে নয়, কখনো হয়তো বিভিন্ন সময়ে একই কবির রচনায়”। তিনি দাবি করলেন “এই কবিরা নতুন সুর এনেছেন আমাদের কাব্যে, ..রবীন্দ্রনাথের পরে প্রথম নতুন সুর”। বুদ্ধদেব বসু এখানে তাঁর মতো করে নিজেদের লেখালিখি নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন, নতুনের পক্ষে তাঁর দাবি সঠিক বলেই মনে হয়। কিন্তু মাননীয় পাঠক এখানে একটা কথা ভেবে দেখতে বলব। তিনি তাঁর লেখায় যে বিশ্ববিধানের কথা উল্লেখ করলেন সেই বিশ্ব কিন্তু প্রকৃত পক্ষে হয়ে দাঁড়াল ইউরোপ ও আমেরিকা এবং বিশ্ববিধান মানে তাদেরই বিধান। একারণেই বিশ্বযুদ্ধের সংশয় অবিশ্বাস ক্লান্তি হতাশা কপটতা অসত্য স্বার্থপরতা বিকৃতি ভোগলালসা একঘেঁয়েমি বিরক্তি শূন্যতা গৃহহীনতা এইসব নেতিবাচক ভাব এক রকম জোর করেই আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাতে বাংলা কবিতায় নতুন সুর এল ঠিকই কিন্তু তাকে ভর্তি হতে হল ইংরেজি মাধ্যম ইস্কুলে অর্থাৎ আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্য না পড়লে বাংলা কবিতার রস-গ্রহণ করার উপায় রইল না। আধুনিকতাবাদের গোপন কৌশল ছিল সেটাই যাতে করে ঔপনিবেশিক দেশগুলির শিক্ষিতজনেরা দেশীয় ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিয়ে সাহেবদের ঐতিহ্যকেই নিজেদের বলে গ্রহণ করে, তাতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শাসন ও শোষণের সুবিধে হবে। বুদ্ধদেব বসুরা এই ফন্দিটি ধরতে পারেননি কিন্তু ভূয়োদর্শী রবীন্দ্রনাথের অনুভবকে তা ফাঁকি দিতে পারেনি। কবি বললেন –“বিলিতি কবিদের আধুনিকতা সহজ ঠেকে না। সে আবিল। তাদের মনটা পাঠককে কনুই দিয়ে ঠেলা মারে। তারা যে বিশ্বকে দেখেছে এবং দেখাচ্ছে সেটা ভাঙন ধরা, রাবিশ-জমা, ধুলো ওড়া। ওদের চিত্ত যে আজ অসুস্থ, অসুখী, অব্যবস্থিত। এ অবস্থায় বিশ্ববিষয় থেকে ওরা বিশুদ্ধভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে না। ভাঙা প্রতিমার কাঠখড় দেখে ওরা অট্টহাস্য করে বলে আসল জিনিসটা এতদিনে ধরা পড়েছে। সেই ঢেলা, সেই কাঠখড়্গুলোকে খোঁচা মেরে লথা বলাকেই ওরা বলে খাঁটি সত্যকে জোরের সঙ্গে স্বীকার করা”। কী আশ্চর্য রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে ইতালিয়ান নিও-মার্কসিস্ট অ্যান্তেনিও গ্রামসি এই আধিপত্যবাদেরই নাম দিলেন “কালচারাল হেগিমনি”। 

No comments:

Post a Comment