Thursday, September 15, 2016

যখন প্রথম ফুটেছে কলি 0 মুরারি সিংহ (২)

যখন প্রথম ফুটেছে কলি 0 মুরারি সিংহ  (২)

এইভাবে বৃহত্তর সমাজের কাছে নতুন প্রজন্ম বরাবর কিছুটা উপেক্ষিত অবহেলিতই থেকে যায়। সভ্যতার আদিকাল থেকেই সমাজ কমবয়সীদের সম্পর্কে চরম নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে আসছে    
কেমন ছিল সেই সব উপলব্ধি, তার কিছু নমুনা দেখুন। -
আজ থেকে ৫০০০ বছর আগে এক ব্যাবিলনবাসী বলেছিলেন – ‘যুবারা তাদের হৃদয়ের দিক দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্থযুব-সম্প্রদায় কুকর্ম তুচ্ছতাচ্ছিল্য-পরায়ণতারা কখনোই প্রাচীনকালের যুবকদের মতো হতে পারবে নাআজকের নতুন প্রজন্ম আমাদের সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারবে নাএই উক্তির প্রায় আর এক হাজার বছর পরে একজন মিশরদেশীয় পুরোহিত মন্তব্য করেছিলেন – ‘এই পৃথিবী এক সংকটের মধ্যে হাজির হয়েছেআমাদের ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মায়েদের আর শ্রদ্ধা-ভক্তি করে নামনে হচ্ছে পৃথিবীর শেষদিন আর বেশি দূরে নয়এই প্রসঙ্গে মিশরীয় পুরুত-ঠাকুরের এই সু-ভাষণের বারো-শো বছর পরে অর্থা ৭২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হোমারের সমসাময়িক গ্রিক কবি হেসিয়োডের অনুভূতিটিও উল্লেখযোগ্যসেটি ছিল এই রকম – ‘আমি আমাদের দেশের ভবিষ্য সম্পর্কে সব আশা হারিয়ে ফেলেছি কারণ আজকের যুবসম্প্রদায় যারা অসহিষ্ণু, যাদের নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই, সোজা কথায় যারা ভয়ংকর, তারাই আগামীকাল দেশের শাসনভার গ্রহণ করবে।(যদিও অনেকেই মনে করেন এটি হেসিয়োডের কথা নয়, পরে তার উপর আরোপিত হয়েছে)এমনকি প্রথাভাঙার কাণ্ডারী বলে বিখ্যাত হলেও সক্রেটিস(খ্রিপূ ৪৭০-৩৯৯)-এর মতো মহান দার্শনিক, শোনা যায় যিনি কম-বয়সীদের সঙ্গে মিশতে বেশি ভালোবাসতেন, তিনি পর্যন্ত একদা মন্তব্য করেছিলেন – ‘‘আমাদের যুব-সম্প্রদায় চায় বিলাসি জীবনযাপন করতে, তারা সব কুসন্তান, তারা কত্তৃত্বকে উপহাস করে এবং বয়স্কদের সম্বন্ধে কোনো শ্রদ্ধা নেইআজকের ছেলেমেয়েরা অত্যাচারী হয়ে উঠেছে, বয়স্করা যখন ঘরে ঢোকে তারা উঠে দাঁড়ায় না, বাবা-মায়ের বিরুদ্ধাচারণ করেসোজা কথায় বললে তার অত্যন্ত বাজে’’
তো গেল বিদেশি জ্ঞানী ও পণ্ডিতদের কথাএবার এ দেশের দিকে একবার তাকানো যাক। 
আমরা জানি, ভারতবর্ষের সমাজ বরাবরই একটু বেশি সাবধানীপ্রাচীনকাল থেকেই সমাজের মুরুব্বিরা উপযাচক হয়ে সমাজরক্ষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে তাদের কাছে যৌবন মানে ছিল এক অতি বিষম কালএক ভয়ংকর সময়তাদের মতে সদ্য-যুবকেরা যা করে তা কেবল বিশৃঙ্খলা, বিপপাত, অশান্তিসুতরাং এই বয়স সবসময়ে সন্দেহজনক
বৈদিক-ব্রাহ্মণ্য সমাজেও কম বয়সীদের নিয়ে বড়োদের মধ্যে সবসময় একটা আতঙ্ক্, একটা কণ্ঠা, একটা গেল গেল রব কাজ করে গেছেসেই সঙ্গে বড়োদের মধ্যে নিজেদের সম্পর্কে কাজ করেছে একটা সুপিওরিটি কমপ্লেক্সতাই বয়স্করা চেয়েছিল ছোটোদের উপর নানান নিষেধাজ্ঞা সংস্কার চাপিয়ে দিতেতরতাজা মনগুলোতে একটা দাসসুলভ মানসিকতা ঢুকিয়ে দিতেতারা চেয়েছিল তাদের মতো কচিকাঁচারাও জ্যাঠামশাইয়ের চশমা দিয়েই জগতটাকে দেখুক।    
সব বাবা-মা- সন্তানকে নিজেদের মনোমতো মানুষ করতে চায়সাদা চোখে তাতে দোষের কিছু নেইআপত্তিও কিছু নেইকিন্তু যে রীতিতে আমরা আজো অভ্যস্ত তা হল নিজেদের মুদ্রাদোষ আগলে আমরা বড়োরা, ছোটোদের স্বাভাবিক বিকাশে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করিআপত্তিটা সেইখানেই 
এই প্রথার সূত্রপাত অবশ্য সেই প্রাচীন ভারতেই
প্রথমে যদি মেয়েদের কথা ধরি, তাহলে বলতে হয় প্রাচীন ভারতের তথাকথিত মুনি-ঋষিরা তাঁদের তৈরি করা সামাজিক নিয়ম-বিধিতে মেয়েদের বিশেষ পাত্তাই দিতে চাননিমহিলাদের জন্যে তারা বাড়ির অন্দরমহলকেই একমাত্র জায়গা হিসেবে বরাদ্দ করে নিদান দিয়েছিলেন যে মেয়েরা বিয়ের আগে পিতার অধীনে এবং বিয়ের পরে স্বামীর অধীনে থাকবেস্মরণ করুন কী ভয়ংকর ছিল সেই দিন, খন সমাজে বাল্যবিবাহের প্রথা চালু করে বালিকাদের স্বাভাবিক বিকাশকে শায়েস্তা করার ব্যবস্থা করা হয়েছিলমেয়েদের বলা হত সুপত্নী হতেবলা হত সীতা-সাবিত্রীর মতো হতেতা এখনো বলা হয়মানুষের মতো মানুষ হবার শিক্ষা তাদের কখনোই দেওয়া হয়নিআসলে আদিকালে শিক্ষার ব্যাপারটাই মোটেই মেয়েদের জন্য উন্মুক্ত ছিল না
এবার ছেলেদের দিকে তাকালে দেখা যাবে তাদের অবস্থাও অথৈবচমানুষের মতো মানুষ হবার শিক্ষা তাদেরও দেওয়া হত নাঅথাকথিত ধ্যানী-জ্ঞানী বৈদিক-সমাজে জাতিভেদ প্রথা জারি করে প্রথমেই সমবয়সী অন্যান্যদের সঙ্গে মেলামেশা রদ করা হয়েছে, শিক্ষার অধিকারকেও করা হয়েছে খর্বতার উপর প্রাচীন শাস্ত্রে উচ্চবর্ণের ছেলেদের জন্যে সমাজকর্তাদের নির্দেশ হল কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন এবং গুরুগৃহ বাসযেখানে তাদের একমাত্র কর্মটি হল পড়াশোনা - ছাত্রনাং অধ্যয়নম তপঃ 
তখনকার সংসারে ছেলেদেরও বলা হত সুপুত্র হতেবোঝানো হত পুত্রদের কাছে শুধু পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম, আর জননী স্বর্গাদপিতাদের মনে গেঁথে দেওয়া হত জন্মসূত্রে ছেলেদের অনেক ঋণ আছেযেমন - পিতৃঋণ ঋষিঋণ, দেবঋণবোঝানো হত ছেলেদের কাজ পরিবারের জাতি-কুল-বিত্ত-প্রতিপত্তি রক্ষা করাতাদের দায়িত্ব পরিবারের বড়ো তথা অভিভাবকদের সুখ-সম্মান সুবিধার দিকে নজর দেওয়া। 
এইভাবে প্রাচীন সমাজে যে প্রথা লাগু ছিল স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে সেখানে ব্রহ্মচর্য শেষ হবার আগেই বালক-বালিকার উপর গার্হস্থ্যকে চাপিয়ে দেওয়ার কী প্রবল প্রচেষ্টাতার উপর ছিল ওই যে এক নির্মম নৃশংস প্রথাজাতিভেদ ছোঁয়াছুয়ির বাধ্যবাধকতাজন্মের দোহাই পেড়ে মানুষের মধ্যে ছোটো-বড়ো ভেদাভেদ তৈরি করা
সুতরাং আদিকাল থেকেই সমাজ সংসারকে নিরাপদ নিশ্চিত রাখতে তার চারপাশে একটা সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হয়েছেনতুন কিছু করার উদ্যোগ প্রতিভাকে কার্যত সেখানে অবদমিত করে রাখা হয়েছে
আপত্তিটা সেইখানেই
আসলে খোলা চোখে দেখলে সমাজ নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানপ্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মতো সেও তার সদস্যদের উপর আধিপত্য জাহির করতে চায় এবং নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়তাদের কাছ থেকে পেতে চায় চরম আনুগত্য দাসত্বআর যেহেতু সমাজের মাথায় থাকে বড়োরা, সুতরাং তারাই কর্তা সেজে বসেঅন্যদিকে অস্তিত্ব, নিরাপত্তা স্বনির্ভরতার দিক দিয়ে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা সেখানে একেবারেই দুর্বল। তাই রক্ষণশীল সমাজ সংসারের খবরদারির প্রকোপটা তাদের উপরেই বেশি এসে পড়েফলে অন্যদের তুলনায় তাদের সংকটও বেড়ে যায়।    

ছোটোদের প্রতি বিরূপ মনোভাবের জন্য অবশ্য বড়োদের তেমন কোনো দোষ নেইতবে বড়োদের কিছু সমস্যা আছেবড়োরা ছোটোদের সংকট বুঝতে চায় নাতারা অল্পবয়সীদের মেরুদণ্ডটাকে তৈরি হতে দেয় নাতারা চায় ছোটোদের থাক একটা গোপাল অতি সুবোধ বালকটাইপ-এর চরিত্রতারা চায় ছোটোরা যেন কখনোই রাখাল হয়ে না যায়তাই বালকদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় যাবতীয় নীতিকথা, তত্ত্ব, উপদেশতাদের চারপাশে তৈরি করা হয় বিধি-নিষেধের ভয়ংকর বেড়াজাল। 

No comments:

Post a Comment